নীতিমালা লঙ্ঘন করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ১৯ ফেসবুক পেইজে মনিটাইজেশন : ডিসমিসল্যাব
ফেসবুকের মূল প্রতিষ্ঠান মেটার নিজস্ব নীতিমালা রয়েছে। সেই নীতি অনুযায়ী সরকারি কোনো প্রতিষ্ঠান ফেসবুক থেকে আয় করতে পারবে না। কিন্তু নিজেদের করা নিয়মই ভঙ্গ করেছে মেটা। বাংলাদেশ পুলিশ ও অন্য বাহিনীর অন্তত ১৯টি পেইজে মনিটাইজেশন চালু রাখা হয়েছে। গবেষণামূলক প্রতিষ্ঠান ‘ডিসমিসল্যাব’ এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য সামনে এসেছে।
স্বাধীন ফ্যাক্ট-চেকিং ও ডিজিটাল মিডিয়া রিসার্চ উদ্যোগ ডিসমিসল্যাবের গবেষণার বরাতে বুধবার (১ অক্টোবর) এ তথ্য জানা গেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, মনিটাইজেশন চালু থাকা পেইজগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ পুলিশ, বাংলাদেশ নৌবাহিনী ও এয়ারপোর্ট আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের ভেরিফায়েড পেজসহ অন্তত ১৪টি জেলা পুলিশের পেজ রয়েছে। এসব পেজের বেশিরভাগই তাদের ক্যাটাগরিতে সরাসরি ‘পুলিশ স্টেশন’, ‘আইন প্রয়োগকারী সংস্থা’, ‘সরকারি প্রতিষ্ঠান’ বা ‘সামরিক বাহিনী’ হিসেবে নিজেদের পরিচয় উল্লেখ করেছে।
নেদারল্যান্ডসভিত্তিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নীতি ও স্বচ্ছতা বিষয়ক গবেষণা সংস্থা ‘হোয়াট টু ফিক্স’-এর মনিটাইজেশন আর্কাইভ এবং মেটার পার্টনার-পাবলিশার তালিকার তথ্যের ভিত্তিতে ডিসমিসল্যাব এই পেইজগুলো শনাক্ত করে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২০ সালের ৬ জুন শেরপুর জেলা পুলিশ ও বাংলাদেশ নৌবাহিনীর পেইজে ফেসবুকের ‘ইন-স্ট্রিম অ্যাডস’ প্রোগ্রাম চালু হয়। এরপর ২০২২ সালের মার্চে বাংলাদেশ পুলিশের ভেরিফাইড পেইজ মনিটাইজেশনে যুক্ত হয়। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে এয়ারপোর্ট আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন এবং ট্যুরিস্ট পুলিশ বাংলাদেশ এতে যুক্ত হয়।
পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ৩১ আগস্ট মেটা তাদের পুরোনো ইন-স্ট্রিম অ্যাডস ও রিলস অ্যাডস পরিবর্তন করে নতুন ‘কন্টেন্ট মনিটাইজেশন’ প্রোগ্রাম চালু করে, যার মাধ্যমে ছবি ও টেক্সট পোস্ট থেকেও উপার্জনের সুযোগ সৃষ্টি হয়। আর্কাইভের তথ্যমতে, ২০২৫ সালের ২ সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ২২ আগস্টের মধ্যে বাংলাদেশ পুলিশসহ ১৯টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পেইজ পর্যায়ক্রমে এই নতুন প্রোগ্রামে যুক্ত হয়। নড়াইল জেলা পুলিশ পেজটি সর্বশেষ ২২ আগস্ট ২০২৬-এ এতে যোগ দেয়।
মেটার পলিসি অনুযায়ী, নতুন কন্টেন্ট মনিটাইজেশন প্রোগ্রামটি কেবল তাদের পক্ষ থেকে দেওয়া বিশেষ আমন্ত্রণে যুক্ত হওয়া যায়। অথচ মেটার ‘পার্টনার-পাবলিশার নীতিমালায়’ পরিষ্কার বলা আছে— সরকারি কোনো প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা মনিটাইজেশন বা আয়ের জন্য যোগ্য হবে না।
একধিকবার বিচ্ছিন্ন ও পুনরায় চালু
২৭ লক্ষাধিক ফলোয়ার থাকা বাংলাদেশ পুলিশের অফিসিয়াল ফেসবুক পেইজটির মনিটাইজেশন সুবিধা বেশ কয়েকবার বন্ধ ও পুনরায় চালু করা হয়েছিল। ২০২২ সালের মার্চে প্রথম যুক্ত হওয়ার ১০ দিন পর এটি বাতিল করা হয়। পরবর্তীতে চারবার বাতিল ও পুনঃসংযুক্ত হওয়ার পর ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে নতুন প্রোগ্রামে যুক্ত হয়ে পেজটিতে বর্তমানে মনিটাইজেশন সচল রয়েছে। একইভাবে চুয়াডাঙ্গা ও কুমিল্লা জেলা পুলিশের পেজেও কন্টেন্ট মনিটাইজেশন চালু রয়েছে। কুমিল্লা জেলা পুলিশের পেজ পরিচালনাকারী এক কর্মকর্তা জানান, গত বছর তাদের পেইজে প্রায় ১০ ডলারের মতো আয় এসেছে, তবে তারা সেই অর্থ উত্তোলন করেননি।
ডিসমিসল্যাব জানিয়েছে, কেবল বাংলাদেশেই নয়; ভারত, ফিলিপাইন, ইসরায়েল, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পেজগুলোতেও মেটার একই ধরনের নিয়মভঙ্গের চিত্র পাওয়া গেছে।
গবেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্টের এঙ্গেজমেন্ট বা ভিউয়ের সঙ্গে আর্থিক আয়ের বিষয় জড়িয়ে পড়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা ব্যাহত হতে পারে। অধিক ক্লিক ও আয়ের আশায় জননিরাপত্তা বা ব্যক্তিগত গোপনীয়তার বিষয়টি উপেক্ষিত হওয়ার ঝুঁকিও থেকে যায়। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে মেটার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাদের সাড়া পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে ডিসমিসল্যাব।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক