লক্ষ্মীপুরে মেঘনার পাড় যেন ‘মিনি কক্সবাজার’
লক্ষ্মীপুরের মেঘনা উপকূলীয় তিন জনপদ—রায়পুর, সদর ও রামগতি উপজেলা। বিশাল মেঘনা নদীর কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা এই জনপদগুলোতে প্রকৃতি যেন উদারহস্তে তার সৌন্দর্য বিলিয়ে দিয়েছে। জেলায় ভালো মানের কোনো বিনোদন কেন্দ্র না থাকায় এবারের ঈদের ছুটিতে মেঘনা নদীর পাড় পরিণত হয়েছে এক প্রাণবন্ত ‘মিনি কক্সবাজার’-এ।
সরকারি ছুটি ও ঈদের এই দিনগুলোতে নদীর পাড়ের পাশাপাশি জেলা সদরের দালাল বাজার জমিদার বাড়ী, খোয়াসাগর দিঘির পাড় ও রায়পুরের জ্বীনের মসজিদেও দর্শনার্থীদের উপচেপড়া ভিড় লক্ষ করা গেছে। ঈদের দিন থেকে শুরু করে শনিবার দুপুর পর্যন্ত সর্বত্রই ছিল মানুষের মুখর উপস্থিতি।
রায়পুর প্রথম শ্রেণির পৌরসভা হলেও গত ৫৪ বছরে সেখানে কোনো বিনোদন কেন্দ্র গড়ে ওঠেনি। ভূমি সংক্রান্ত জটিলতায় একটি শিশু পার্ক নির্মিত হলেও চরম অবহেলায় সেটির মালামাল চুরি হয়ে গেছে। ফলে রায়পুর ও সদরের বাসিন্দাদের প্রধান ভরসা এখন মেঘনার পাড়।
উপজেলা পরিষদ থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত চরবংশী ইউনিয়নের সাজু মোল্লা ঘাট ও আলতাফ মাস্টার ঘাট এবং সদর উপজেলার মজুচৌধুরীর লঞ্চ ঘাট এখন দর্শনার্থীদের অন্যতম আকর্ষণ। অন্যদিকে, রামগতি উপজেলা পরিষদ ভবন থেকে মাত্র একশ’ গজ দূরে আলেকজান্ডার এলাকায় মেঘনার ভাঙনরোধে নির্মিত শক্ত বাঁধটি এখন শুধু শহরকেই সুরক্ষা দিচ্ছে না, তৈরি করেছে এক চমৎকার প্রাকৃতিক বিনোদন কেন্দ্র।
বাঁধের ওপর দাঁড়ালে যত দূর চোখ যায়, শুধু বিস্তীর্ণ জলরাশি চোখে পড়ে। জোয়ার–ভাটার ঢেউ এসে আছড়ে পড়ে কিনারে, আর নদীর বুক চিরে বয়ে আসা বাতাসে ভেসে আসে নির্মল প্রশান্তি। বিকেল গড়ালে পশ্চিম আকাশের রক্তিম সূর্যাস্ত আর নদীর ঢেউ মিলিয়ে তৈরি হয় এক অপার্থিব দৃশ্যপট। সোনালি আলো নদীর জলে প্রতিফলিত হয়ে সৃষ্টি করে মনোমুগ্ধকর পরিবেশ।
নদীর পাড়ে জেগে ওঠা নতুন বালুর বেলাভূমি, ঢেউয়ের ছন্দ আর জলের মিষ্টি শব্দে দর্শনার্থীরা খুঁজে পাচ্ছেন অন্যরকম প্রশান্তি। অনেকের কাছেই এটি এখন ‘স্বল্প খরচে স্বর্গীয় ভ্রমণ’। ভ্রমণ পিপাসুরা কেউ নৌকা ভ্রমণে নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করছেন, কেউবা পরিবার নিয়ে ছবি তুলছেন বালুচরে।
ঈদ উপলক্ষে রায়পুরের সাজু মোল্লার ঘাটে পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা চাকুরিজীবী হেলাল আহম্মেদ বলেন, জেলায় ভালো কোনো বিনোদন কেন্দ্র নেই, সিনেমা হলগুলোও বহু বছর ধরে বন্ধ। শহরের একঘেয়ে জীবন থেকে বের হয়ে নদীর পাড়ে এসে দারুণ স্বস্তি লাগছে।
খুশবু আক্তার নামের এক গৃহবধূ জানান, নদীতে জেলেদের ইলিশ ধরার দৃশ্য এবং ট্রলারে করে দূরের জেগে ওঠা নতুন চরে ঘুরে আসা সত্যিই রোমাঞ্চকর।
ষাটোর্ধ্ব মহসিন মিয়া নাতি-নাতনিদের নিয়ে ঘুরতে এসে জানান, মেঘনা পাড়ই এখন তাদের প্রধান বিনোদনস্থল, তবে এখানে পর্যটকদের বসার ব্যবস্থা ও অবকাঠামো আরও উন্নত করা প্রয়োজন।
স্থানীয় স্কুল শিক্ষক সজিব হোসেন জানান, সেনাবাহিনীর উদ্যোগে নির্মিত এই বাঁধে পলি জমে প্রাকৃতিক বেলাভূমি সৃষ্টি হয়েছে, যা রক্ষায় নিয়মিত পরিচর্যা ও অসমাপ্ত বাঁধের কাজ দ্রুত শেষ করা দরকার। এদিকে, গত কয়েকদিন ধরে রায়পুরের ইউএনও মেহেদী হাসান কাউছার প্রশাসনের তহবিল থেকে অর্থ ব্যয় করে এখানে চমৎকার একটি পর্যটন কেন্দ্র তৈরি করে দিয়েছেন, যার জন্য স্থানীয়রা তাকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।
বিনোদনের এই আনন্দের মাঝেও রয়ে গেছে বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি। নদীতে কোনো ধরনের লাইফ জ্যাকেট বা নিরাপত্তা সরঞ্জাম ছাড়াই অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে ট্রলার ও স্পিডবোটে ঘুরছেন পর্যটকরা। পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা নেয়ামত হোসেন এই নিয়ে ক্ষোভ ও ভয় প্রকাশ করেন। তবে ট্রলার চালক কিরণ মাজি বলেন, ১২ বছর ধরে এই নদীতে ট্রলার চালাই। জোয়ার-ভাটা বুঝেই চলাচল করি, তাই এখনো বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি।
মেঘনা পাড়ের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে লক্ষ্মীপুরের জেলা প্রশাসক এস এম মেহেদী হাসান বলেন, চারটি উপজেলার মানুষের কাছে মেঘনা পাড় এখন অন্যতম বিনোদন কেন্দ্র। ঈদ উপলক্ষে দর্শনার্থীর সংখ্যা বেড়েছে কয়েকগুণ। সেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন রয়েছে এবং ট্রলার ও স্পিডবোটে ভ্রমণের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।
সব মিলিয়ে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, নদীর বিশালতা আর মানুষের প্রাণোচ্ছ্বাস রায়পুর-রামগতির মেঘনা পাড়কে দক্ষিণাঞ্চলের এক অনন্য এবং আকর্ষণীয় ভ্রমণ গন্তব্যে পরিণত করেছে।

বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)