মরক্কোর কাসাব্লাঙ্কায় কী দেখবেন এবং কী করবেন
আটলান্টিক মহাসাগরের অবিরাম ঢেউ আর আধুনিক নগরজীবনের এক অপূর্ব মেলবন্ধন হলো মরক্কোর বৃহত্তম শহর কাসাব্লাঙ্কা। স্থানীয়দের কাছে এটি 'দার আল বেইদা' বা ‘সাদা বাড়ি’ নামে পরিচিত। অনেকেই মরক্কো বলতে কেবল প্রাচীন ধাঁচের মেদিল্যান্ড বা মরুভূমির কথা ভাবেন, তবে কাসাব্লাঙ্কা তার চেয়ে একেবারেই আলাদা।
এটি মরক্কোর অর্থনৈতিক হৃদপিণ্ড এবং উত্তর আফ্রিকার বৃহত্তম বন্দরের আবাসস্থল। ৩০ লক্ষাধিক মানুষের এই ব্যস্ত মহানগরে যেমন রয়েছে সুউচ্চ আধুনিক ভবন ও পশ্চিমা ফ্যাশনের ছোঁয়া, তেমনই রয়েছে শতাব্দীর পুরোনো ইসলামিক স্থাপত্য ও মরক্কোন সংস্কৃতির গভীর টান। আপনি ইতিহাসপ্রেমী হোন, খাদ্যরসিক হোন কিংবা কেনাকাটার ভক্ত কাসাব্লাঙ্কা আপনাকে নিরাশ করবে না।
কাসাব্লাঙ্কার ইতিহাস
সপ্তম শতাব্দীতে বারবার উপজাতির হাত ধরে একটি স্বাধীন রাজ্য হিসেবে এই শহরের যাত্রা শুরু হয়। এরপর ক্রমান্বয়ে এটি আরব, আলমোরাভিদ, মেরেনিড, পর্তুগিজ এবং স্প্যানিশ শাসকদের অধীনে আসে। পর্তুগিজরাই প্রথম এর নাম দিয়েছিল 'কাসাব্রাঙ্কা'। ১৭০০ শতকের মাঝামাঝি সময়ে এক বিধ্বংসী ভূমিকম্পে শহরটি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেলে আলাউইত রাজবংশের শাসক মৌলে ইসমাইলের নাতি এটি পুনর্নির্মাণ করেন। পরবর্তীতে ১৯০৭ সালে ফরাসিরা এর নিয়ন্ত্রণ নেয়, যা ১৯৫৬ সালে মরক্কোর স্বাধীনতা পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। এই বহু সংস্কৃতির ইতিহাসই আজকের কাসাব্লাঙ্কাকে অনন্য করে তুলেছে।
কাসাব্লাঙ্কার মূল আকর্ষণ
হাসান দ্বিতীয় মসজিদ
এটি কাসাব্লাঙ্কার প্রধান ল্যান্ডমার্ক এবং বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মসজিদ। আটলান্টিক মহাসাগরের একেবারে কোল ঘেঁষে অবস্থিত এই মসজিদের কারুকার্য চোখ ধাঁধানো। কাঠ, মার্বেল, গ্রানাইট এবং প্লাস্টারের সূক্ষ্ম কাজ এর ভেতরে এক স্বর্গীয় আবহ তৈরি করে। এর একটি বিশেষ অংশে কাঁচের মেঝে রয়েছে, যা দিয়ে নিচের সমুদ্রের জলরাশি দেখা যায়। প্রতিদিন এখানে গাইডেড ট্যুরের ব্যবস্থা থাকে এবং এর পাশেই রয়েছে একটি চমৎকার জাদুঘর।
ওল্ড মদিনা, বাব মারাকেচ এবং স্কলা
কাসাব্লাঙ্কার প্রাচীন রূপ দেখতে চাইলে আপনাকে যেতে হবে ওল্ড মদিনার আঁকাবাঁকা ও সরু গলিতে। নিজে পথ হারানোর ভয় থাকলে একজন গাইড সাথে নেওয়া ভালো। এখানকার বিখ্যাত স্পটগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রাচীন প্রবেশদ্বার 'বাব মারাকেচ', ওল্ড মদিনা ক্লক টাওয়ার এবং ১৮ শতকের ঐতিহাসিক প্রাচীর 'স্কলা'। এখানকার কারিগর পাড়ায় মিলবে অসাধারণ সব হস্তশিল্প।
লা কর্নিশ
আইন দিয়াব এলাকায় সমুদ্রের পাড় ঘেঁষে গড়ে ওঠা এই আঁকাবাঁকা রাস্তাটি স্থানীয় ও পর্যটকদের আড্ডার প্রিয় জায়গা। চমৎকার সব রেস্তোরাঁ, সুইমিং পুল এবং মনোরম সৈকতে ঘেরা এই এলাকায় বিকেল বা সন্ধ্যায় হাঁটা এক দারুণ অভিজ্ঞতা।
প্লেস মোহাম্মদ পঞ্চম
এটি শহরের মূল চত্বর, যার কেন্দ্রে রয়েছে একটি বিশাল ফোয়ারা। এই চত্বরকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে ফ্রেঞ্চ কনস্যুলেট, মেইন পোস্ট অফিস, প্যালেস অব জাস্টিস এবং ব্যাংক অব মরক্কোর মতো ঐতিহাসিক ও দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্যের ভবনগুলো।
কোয়ার্টিয়ার ডেস হাবুস, পালে রয়্যাল ও মাহকামা দু পাশা
রাজপ্রাসাদের ঠিক পেছনে অবস্থিত 'হাবুস ডিস্ট্রিক্ট' মূলত খিলানযুক্ত সুন্দর ভবনে ঘেরা এক বিশাল বাজার। এখান থেকে রাজকীয় প্রাসাদ খুব কাছেই। পাশেই রয়েছে 'মাহকামা দু পাশা', যার বাইরের অংশ সাধারণ হলেও ভেতরের মরিশ স্থাপত্যশৈলী অত্যন্ত চমৎকার।
দ্য বাজার
ডাউনটাউনের এই ঐতিহ্যবাহী বাজারে মিলবে চামড়া, সিরামিক, কাঠ ও ধাতুর তৈরি স্যুভেনির, অ্যান্টিক সামগ্রী এবং হাতে বোনা মরক্কোন কার্পেট।
স্থানীয়দের এই প্রধান বাজারে সবজি, ফলমূল ও স্ট্রিট ফুড পাওয়া যায়। এখানকার মূল আকর্ষণ মাছের বাজার, যেখানে তাজা মাছ কিনে পাশের দোকানেই নিজের পছন্দমতো রান্না করিয়ে নেওয়া যায়।
কোয়ার্টিয়ার আরিফ ফ্যাশনেবল বুটিক, জুতো ও হোম ডেকেরের জন্য এই এলাকাটি বিখ্যাত। এখানকার 'টুইন সেন্টার' নামের ২৮ তলা বিশিষ্ট দুই আকাশচুম্বী ভবন দেখার মতো।
মরক্কো মল এবং আনফাপ্লেস আটলান্টিকের তীরে অবস্থিত দেশের বৃহত্তম দুটি মল। মরক্কো মলে গুচি বা ফেন্ডির মতো লাক্সারি ব্র্যান্ডের পাশাপাশি শিশুদের জন্য রয়েছে 'অ্যাডভেঞ্চারল্যান্ড' নামের ইনডোর পার্ক (আইস স্কেটিং রিঙ্কসহ)।
কাসাব্লাঙ্কা কেবল মরক্কোর একটি ব্যস্ত অর্থনৈতিক কেন্দ্রই নয়, বরং এটি ঐতিহ্য ও আধুনিকতার এক অপূর্ব প্রবেশদ্বার। আটলান্টিক সাগরের মনমুগ্ধকর হাওয়া, হাসান দ্বিতীয় মসজিদের নান্দনিক স্থাপত্য, ওল্ড মদিনার প্রাচীন গলি আর আধুনিক শপিং মলের জমকালো পরিবেশ সব মিলিয়ে এই শহর প্রতিটি ভ্রমণকারীকে এক বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতা উপহার দেয়। আপনি যদি মরক্কোর ইতিহাসের প্রাচীন স্পন্দন ছোঁয়ার পাশাপাশি তার বর্তমানের গতিশীল রূপটি উপভোগ করতে চান, তবে কাসাব্লাঙ্কা আপনার ভ্রমণ তালিকায় অবশ্যই শীর্ষস্থানে থাকা উচিত। এটি এমন এক শহর, যার ব্যস্ত কোলাহলের ভেতরেও লুকিয়ে আছে এক চিরন্তন আরব্য রোমাঞ্চ।

ফিচার ডেস্ক