ইরানে বিক্ষোভ ও ট্রাম্পের হুমকি নিয়ে যা বলল প্রভাবশালী দেশগুলো
ইরানে ডিসেম্বরের শেষের দিক থেকে চলমান বিক্ষোভ নিয়ে বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলোর মধ্যে মতভেদ সৃষ্টি করেছে। কয়েকটি দেশের সরকার বিক্ষোভে বিদেশি শক্তির প্ররোচণা রয়েছে বলে ইরানের দাবি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, আবার অন্য কয়েকটি রাষ্ট্র ইরানের নেতাদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভকারীদের ওপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সহিংস প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছে। খবর আল জাজিরার।
ইরান সরকারের বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ স্বীকার করলেও তাদের মধ্যে বিদেশি শক্তির ইন্ধন থাকার বিষয়টিও দাবি করেছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেন, ইরান যুদ্ধ চায় না, তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামরিক পদক্ষেপের হুমকি দেওয়ার পর তেহরান সব ধরনের বিকল্প উপায়গুলোর জন্য প্রস্তুত।
গত রোববার আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম জানায়, বিক্ষোভে ১০৯ জন নিরাপত্তা কর্মী নিহত হয়েছেন। ইয়ারানের সরকার নিহত বিক্ষোভকারীদের সংখ্যা নিশ্চিত করেনি। তবে দেশের বাইরে অবস্থানরত বিরোধী কর্মীরা জানান, নিহতের সংখ্যা আরও বেশি এবং এতে শত শত বিক্ষোভকারী রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র
বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগের বিরুদ্ধে ইরানের নেতাদের হুঁশিয়ারি দিয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি একাধিকবার বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানে সামরিক পদক্ষেপের কথা বিবেচনা করছে।
রোববার রাতে এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘সেনাবাহিনী এটি দেখছে এবং আমরা কিছু খুব শক্তিশালী বিকল্পের কথা ভাবছি। আমরা এ নিয়ে একটি সিদ্ধান্ত নেব।’
গত সপ্তাহে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, ‘ইরান স্বাধীনতার দিকে তাকিয়ে, সম্ভবত আগের মতো নয়। যুক্তরাষ্ট্র সাহায্য করতে প্রস্তুত!’
ইসরায়েল
ইরানের সবচেয়ে বড় আঞ্চলিক শত্রু ইসরায়েল বিক্ষোভকারীদের প্রতি দৃঢ় সমর্থন জানিয়েছে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু মন্ত্রিসভার বৈঠকে ‘ইরানের নাগরিকদের অসাধারণ বীরত্বের’ প্রশংসা করেন।
অন্যদিকে ইসরায়েলের সেনাবাহিনী বলেছে, ইরানে চলমান বিক্ষোভ অভ্যন্তরীণ, তবে সেনাবাহিনী প্রয়োজনে শক্তি দিয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে প্রস্তুত।
যুক্তরাজ্য
যুক্তরাজ্যের মন্ত্রী পিটার কাইলও ইরানে সামরিক পদক্ষেপকে সমর্থনের সম্ভাবনা উড়িয়ে দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। সম্প্রচারমাধ্যম স্কাই নিউজকে তিনি বলেন, ‘অনেক যদি আছে’।
বিরোধী কনজারভেটিভ দলের নেতা কেমি ব্যাডেনোচ সামরিক হস্তক্ষেপের বিষয়ে বিবিসিকে বলেন, ‘আমরা জনগণের প্রতি যে হুমকি দেখছি, তা বিবেচনা করে আমি মনে করি—এটাই সঠিক হবে।’
ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)
ইইউ বলেছে, তারা নতুন নিষেধাজ্ঞার প্রস্তাব দিতে প্রস্তুত। ২৭ দেশের এই জোটের ইতোমধ্যে ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করেছে।
যুক্তরাজ্য, জার্মানি ও ফ্রান্স গত সপ্তাহে একটি যৌথ বিবৃতিতে বিক্ষোভকারীদের হত্যার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।
জার্মানি
ইরানে ইসলামী বিপ্লবী সরকারের ক্ষমতা অবসানের দিকে ইঙ্গিত করে জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্জ সাংবাদিকদের বলেন, ‘যখন কোনো শাসনব্যবস্থা কেবল সহিংসতার মাধ্যমে ক্ষমতা ধরে রাখতে পারে, তখনই তা কার্যকরভাবে শেষ হয়ে যায়।’
ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক ও সামরিক সম্পর্ক রয়েছে জার্মানির। গাজায় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের গণহত্যার যুদ্ধকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করেছে দেশটি। তারা এর আগে বিক্ষোভ দমনে ইরানের সহিংস প্রতিক্রিয়াকে শক্তি নয়, বরং দুর্বলতার লক্ষণ হিসেবে বর্ণনা করেছিল।
জাপান
পররাষ্ট্রমন্ত্রী তোশিমিতসু মোতেগি বলেছেন, জাপান সরকার তাৎক্ষণিক সহিংসতা বন্ধের জন্য জোরালো আহ্বান জানাচ্ছে এবং পরিস্থিতির দ্রুত সমাধান দৃঢ়ভাবে আশা করছে।
চীন
চীন অবশ্য ইরানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তারা অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বহিরাগত হস্তক্ষেপের বিরোধিতা প্রকাশ করেছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র বলেন, সব জাতির সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী সম্পূর্ণ সুরক্ষিত থাকা উচিত।
রাশিয়া
রাশিয়ার নিরাপত্তা পরিষদের সেক্রেটারি ও সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী সের্গেই শোইগু ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সেক্রেটারি আলী লারিজানির সঙ্গে টেলিফোনে বিক্ষোভ নিয়ে কথা বলেন। তিনি ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের জন্য বিদেশি শক্তির সর্বশেষ প্রচেষ্টার নিন্দা জানান।
তুরস্ক
তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান বলেন, বিক্ষোভগুলো বিদেশ থেকে ইরানের প্রতিদ্বন্দ্বীরা পরিচালনা করছে। এই বিক্ষোভে ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থার হাত রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
হাকান ফিদান আরও বলেন, মোসাদ এটা গোপনে করে না; তারা তাদের নিজস্ব ইন্টারনেট ও টুইটার অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে ইরানের জনগণকে সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের আহ্বান জানাচ্ছে।
জাতিসংঘ
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, ইরানে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতার খবরে তিনি মর্মাহত। সরকারকে সংযম দেখানোর আহ্বান জানান তিনি।
জাতিসংঘ মহাসচিব বলেন, সব ইরানিদের অবশ্যই নির্ভয়ে ও শান্তিপূর্ণভাবে তাদের অভিযোগ প্রকাশ করার সুযোগ থাকতে হবে।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক