যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংকট : মূল খেলোয়াড় কারা?
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের অস্থিরতা এখন চরম বিস্ফোরণের দ্বারপ্রান্তে। গত কয়েক মাস ধরে ইরানের অভ্যন্তরীণ গণ-বিক্ষোভ ও তাকে কেন্দ্র করে তেহরান সরকারের কঠোর দমন-পীড়নের পর পরিস্থিতির মোড় নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে। একদিকে ইসরায়েল, অন্যদিকে আমেরিকার ‘সর্বোচ্চ চাপ’ প্রয়োগের নীতি—সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে এখন যুদ্ধের ঘনঘটা। ইরানের বিভিন্ন কৌশলগত ও সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অতর্কিত বিমান ও ড্রোন হামলার পর এই সংকট এক নতুন ও ভয়ংকর ধাপে প্রবেশ করেছে।
এই সংঘাত কেবল দুটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এর পেছনে কাজ করছে শক্তিশালী কিছু ব্যক্তির রাজনৈতিক দর্শন, সামরিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও আঞ্চলিক আধিপত্যের লড়াই। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর ইরান নীতি থেকে শুরু করে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির অনমনীয়তা—প্রতিটি পদক্ষেপই বিশ্ব মানচিত্রের শান্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। এই সংকটের গভীরে লুকিয়ে থাকা মূল ‘খেলোয়াড়’ ও তাদের নেওয়া কৌশলগুলো বুঝতে পারলে বর্তমান পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
নিচে এই সংকটের প্রধান কারিগর ও তাদের বর্তমান অবস্থানের বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরা হলো :
১. ডোনাল্ড ট্রাম্প (মার্কিন প্রেসিডেন্ট)
ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে ‘সর্বোচ্চ চাপ’ প্রয়োগের নীতির প্রবক্তা। ২০১৮ সালে পারমাণবিক চুক্তি থেকে সরে দাঁড়িয়ে তিনি তেহরানকে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল করার চেষ্টা করেন। একদিকে তিনি নিজেকে শান্তিরক্ষী দাবি করলেও, অন্যদিকে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা ও গণ-বিক্ষোভ দমনে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত রেখেছেন।
২. আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি (ইরানের সর্বোচ্চ নেতা)
১৯৮৯ সাল থেকে ক্ষমতায় থাকা খামেনি ইরানের সকল গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের চূড়ান্ত অধিকারী। তিনি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণকে সার্বভৌম অধিকার মনে করেন ও মার্কিন আধিপত্যের বিরুদ্ধে ‘অবাধ্যতার প্রতীক’ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, ইরান কখনোই আমেরিকার কাছে আত্মসমর্পণ করবে না।
৩. বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু (ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী)
নেতানিয়াহু ইরানকে ইসরায়েলের জন্য ‘অস্তিত্বের সংকট’ হিসেবে দেখেন। তিনি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সমর্থন বন্ধে সামরিক পদক্ষেপের পক্ষে সবচেয়ে বেশি সোচ্চার। তিনি প্রায়ই ইরানের সাধারণ মানুষকে তাদের বর্তমান শাসকদের উৎখাত করার সরাসরি আহ্বান জানিয়ে থাকেন।
৪. রেজা পাহলভি (ইরানের শেষ শাহের পুত্র)
যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসিত পাহলভি নিজেকে ইরানের গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের নেতা হিসেবে তুলে ধরছেন। সাম্প্রতিক সরকার বিরোধী বিক্ষোভে তার নাম স্লোগান দিতে দেখা যায়। তিনি সরাসরি ওয়াশিংটনকে ইরানের বর্তমান সরকারকে উৎখাত করতে হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন। তবে বিরোধীদের মধ্যে তাকে নিয়ে বিতর্কও রয়েছে।
৫. মোহাম্মদ বিন সালমান (সৌদি ক্রাউন প্রিন্স)
সৌদি আরবের এই প্রভাবশালী নেতা ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব নিয়ে সবসময়ই সতর্ক। একসময় খামেনিকে তীব্র সমালোচনা করলেও ২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক পুনরুদ্ধারে কাজ করেন। বর্তমানে তিনি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন ও বড় ধরনের কোনো যুদ্ধ যেন এই অঞ্চলের অর্থনীতি ও তেলের বাজারকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে, সেদিকে নজর রাখছেন।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক