হরমুজ প্রণালি বন্ধের সঙ্গে তেলের দাম বৃদ্ধির সম্পর্ক কী?
বিশ্বের জ্বালানি অর্থনীতির ‘লাইফলাইন’ হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালি। বর্তমানে ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এই রুটটি বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা বিশ্ব তেলের বাজারে চরম অস্থিরতা তৈরি করেছে। মূলত বিশ্বব্যাপী তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রায় ২০-৩০ শতাংশই এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। মার্কিন জ্বালানি তথ্য প্রশাসন (ইআইএ)-এর ২০২৪ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতিদিন প্রায় ২০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল এই প্রণালি দিয়ে পার হয়, যার বাজারমূল্য প্রায় ৫০০ বিলিয়ন ডলার।
বিশ্লেষকদের মতে, তেলের দাম বৃদ্ধির সঙ্গে এই প্রণালির সম্পর্ক সরাসরি ও অত্যন্ত সংবেদনশীল। যদি ইরান এই রুটটি আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ করে দেয়, তবে রাতারাতি বিশ্ববাজারে তেলের এক-পঞ্চমাংশ সরবরাহ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের মতে, এই সরবরাহ ঘাটতির ভয়েই তেলের দাম অনেকটাই ঊর্ধ্বমুখী হবে। এছাড়া লিকুইফাইড ন্যাচারাল গ্যাস বা এলএনজি -এর এক-পঞ্চমাংশও এই পথ দিয়ে আসায় জ্বালানি সংকটের প্রভাব হবে বহুমুখী।
ক্যাপিটাল ইকোনমিক্সের মতে, অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলারে দীর্ঘস্থায়ী হলে তা বিশ্বব্যাপী মুদ্রাস্ফীতি ০.৬-০.৭ শতাংশ বাড়িয়ে দিতে পারে, যা কোনো দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে সরাসরি মন্দার দিকে ঠেলে দেবে।
ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরায়েলের আক্রমণের ফলে তেহরান থেকে দ্রুত প্রতিশোধমূলক আক্রমণ শুরু হয়েছে। যার লক্ষ্য মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক দেশ, যার মধ্যে রয়েছে ইসরায়েল, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, বাহরাইন, জর্ডান, সৌদি আরব, ইরাক ও ওমান।
ইরানি কর্মকর্তারা বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক রুট হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার ইঙ্গিত দেওয়ার পর বিশ্লেষকরা বিশ্বব্যাপী তেলের দাম বৃদ্ধির বিষয়ে সতর্ক করছেন। গত শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) ইউরোপীয় ইউনিয়নের একজন কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, প্রণালি অতিক্রমকারী জাহাজগুলো ইরানের অভিজাত ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) থেকে অত্যন্ত উচ্চ ফ্রিকোয়েন্সি ট্রান্সমিশন পাচ্ছে, তারা বলছে, ‘কোনো জাহাজকে হরমুজ প্রণালি পার হতে দেওয়া হচ্ছে না’।
তবে, ইইউ কর্মকর্তা বলছেন, ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে প্রণালি বন্ধ করেনি। পরিবর্তে, এই অঞ্চলে চলমান সংঘাতের মধ্যে বেশ কয়েকটি ট্যাঙ্কার মালিক প্রণালি দিয়ে তেল ও গ্যাস সরবরাহ স্থগিত করেছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে রয়টার্সকে একটি প্রধান ট্রেডিং ডেস্কের একজন শীর্ষ নির্বাহী বলেন, ‘আমাদের জাহাজগুলো বেশ কয়েকদিন ধরে আটকে থাকবে’। গ্রিসের মতো দেশগুলোও তাদের জাহাজগুলোকে জলপথ দিয়ে যাতায়াত এড়াতে পরামর্শ দিয়েছে। এই গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথে যেকোনো অস্থিরতা বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে বিঘ্নিত করতে পারে।
হরমুজ প্রণালি কী ও এর প্রভাব কী?
হরমুজ প্রণালির একপাশে ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং অন্যপাশে ইরান অবস্থিত। এটি পারস্য উপসাগরকে আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এই জলপথটি এতটাই সংকীর্ণ যে এর সবচেয়ে কম প্রশস্ত জায়গাটি মাত্র ৩৩ কিলোমিটার। এছাড়া জাহাজ চলাচলের জন্য নির্ধারিত লেনগুলো মাত্র তিন কিলোমিটার চওড়া হওয়ায় এটি সবসময়ই আক্রমণের ঝুঁকিতে থাকে। তবে সরু হওয়া সত্ত্বেও বিশ্বের বিশাল সব তেলবাহী জাহাজ এই পথ দিয়েই যাতায়াত করে।
কতটা তেল ও গ্যাস এই পথে সরবরাহ হয়?
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের প্রধান ধমনি। ২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী, প্রতিদিন এই পথ দিয়ে প্রায় ২ কোটি (২০ মিলিয়ন) ব্যারেল তেল পার হয়, যার বাজারমূল্য প্রায় ৫০০ বিলিয়ন ডলার। ইরান, ইরাক, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত— এই দেশগুলো তাদের তেল পাঠানোর জন্য এই পথের ওপর নির্ভরশীল। এছাড়া সারা বিশ্বের মোট এলএনজি বা প্রাকৃতিক গ্যাসের ২০ শতাংশই এই ছোট জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়।
এই তেল ও গ্যাস কোথায় যায়?
এই পথের ওপর সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল এশিয়ার বাজার। এখান দিয়ে যাওয়া ৮৪ শতাংশ অপরিশোধিত তেল ও ৮৩ শতাংশ এলএনজি সরাসরি এশিয়ায় যায়। বিশেষ করে চীন, ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া সম্মিলিতভাবে এই পথের ৬৯ শতাংশ তেল ব্যবহার করে। তাই এই পথে কোনো সমস্যা হলে বা তেলের দাম বাড়লে এশিয়ার দেশগুলোই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
তেলের দামের ওপর কী প্রভাব পড়বে?
সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে এই পথে জাহাজ চলাচল অনেক কমে গেছে। বর্তমানে ওমান উপকূলের কাছে তেল ট্যাঙ্কারে হামলার ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে এবং প্রায় ১৫০টি জাহাজ সাগরে নোঙর করে অপেক্ষা করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ প্রণালি যদি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়, তবে রাতারাতি বিশ্বের মোট তেলের ২০ শতাংশ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাবে। এর ফলে শুধু তেলের অভাব নয়, বরং আতঙ্কের কারণেই দাম আকাশচুম্বী হবে। যদি তেলের দাম দীর্ঘ সময় ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলারে আটকে থাকে, তবে বিশ্বজুড়ে জিনিসের দাম (মুদ্রাস্ফীতি) অনেক বেড়ে যাবে ও দুর্বল অর্থনীতিগুলো মন্দার কবলে পড়বে।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক