১৯৯১ সালের পর চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা সর্বনিম্ন
চীন তার বার্ষিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যে নির্ধারণ করেছে। এটি ১৯৯১ সালের পর দেশটির সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা। অভ্যন্তরীণ সংকট ও বৈশ্বিক প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই অর্থনীতি এখন এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করছে। খবর বিবিসরি।
২০২৩ সালে লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ৫ শতাংশ নির্ধারণ করার পর এটিই প্রথম বড় ধরনের হ্রাস। উল্লেখ্য, মহামারির কারণে ২০২০ সালে কোনো লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত ছিল না। বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত চীনের বৃহত্তম বার্ষিক রাজনৈতিক সমাবেশ ‘দুটি অধিবেশনে’ এই নতুন লক্ষ্যমাত্রা ও ১৫তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশ করা হয়।
বহুমুখী সংকটে বেইজিং
প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং কর্তৃক উপস্থাপিত ৪৬ পৃষ্ঠার সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে চীনের অর্থনীতির বর্তমান নাজুক অবস্থা ও তা পুনর্গঠনের জরুরি প্রয়োজনীয়তা স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। বেইজিং বর্তমানে এমন এক জটিল পরিস্থিতির মোকাবিলা করছে যেখানে অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক উভয় সংকটই বিদ্যমান। চীনের সাধারণ জনগণ এখন ব্যয়ের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্ক হয়ে পড়েছে, যার ফলে অভ্যন্তরীণ ব্যবহার বা কনজাম্পশন উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। এই সমস্যার পাশাপাশি তীব্র হচ্ছে জনসংখ্যাগত সংকট; দ্রুত হ্রাস পাওয়া জন্মহার ও ক্রমবর্ধমান বার্ধক্যজনিত জনসংখ্যা দেশটির দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনাগুলোকে প্রতিনিয়ত বাধাগ্রস্ত করছে। আবাসন বা রিয়েল এস্টেট খাতের দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতাও প্রবৃদ্ধির ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক চাপ সৃষ্টি করে চলেছে।
অন্যদিকে, বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিও চীনের অর্থনীতির জন্য নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরান যুদ্ধের ফলে বেইজিং তার সস্তা তেলের একটি বড় উৎস হারিয়ে তীব্র জ্বালানি সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। এর ওপর জানুয়ারি মাসে ভেনেজুয়েলার তেল সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়া পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। একই সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরোপিত নতুন শুল্ক নীতি চীনের রপ্তানি-নির্ভর অর্থনীতির ওপর বিশাল চাপের সৃষ্টি করেছে, যা দেশটিকে বৈশ্বিক বাণিজ্যে কঠিন প্রতিযোগিতার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
এই বহুমুখী সংকট উত্তরণে প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং চীনের ১৫তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার মূল লক্ষ্যগুলো ঘোষণা করেছেন। আগামী পাঁচ বছরে চীন মূলত উদ্ভাবন, উচ্চ প্রযুক্তির শিল্প ও বৈজ্ঞানিক গবেষণাকে তার অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে গড়ে তোলার ওপর বিশেষ জোর দেবে। শিল্পায়ন ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের লক্ষ্যে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, পরিবহন এবং শক্তি খাতের ওপর ভিত্তি করে ১০০টিরও বেশি মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। বেইজিং মনে করছে, এসব বড় বিনিয়োগ অর্থনীতির ঝিমিয়ে পড়া ভাব কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করবে।
জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চীন এখন জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সবুজ শক্তি বা গ্রিন এনার্জির দিকে দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে। কার্বন নিঃসরণ হ্রাস ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর মাধ্যমে চীন একটি পরিবেশবান্ধব শিল্প কাঠামো গড়ার লক্ষ্য নিয়েছে। সামাজিক স্থিতিশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির স্বার্থে একটি ‘প্রসব-বান্ধব সমাজ’ গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা ও স্বাস্থ্যসেবা খাতের আমূল পরিবর্তন আনার মাধ্যমে জনগণের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন ও সামাজিক উদ্বেগগুলো সমাধানের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে এই পরিকল্পনায়।
সরকারি তথ্যমতে, চীন ২০২৫ সালের জন্য তার ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিল। তবে বছরের শেষ তিন মাসে এই প্রবৃদ্ধি কমে ৪ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে আসে।
জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক নিং লেং-এর মতে, যদিও চীন গত বছর ১.১৯ ট্রিলিয়ন ডলারের রেকর্ড বাণিজ্য উদ্বৃত্ত অর্জন করেছে, তবুও প্রবৃদ্ধির জন্য রপ্তানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা দেশটির জন্য একটি দুর্বলতা। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য যুদ্ধের ফলে চীন এখন অন্যান্য দেশের সঙ্গে বাণিজ্য পুনর্নির্দেশ করতে বিপুল সম্পদ ব্যয় করছে।
চীনের অর্ধেকেরও বেশি (দুই-তৃতীয়াংশ) প্রদেশ এখন তাদের অর্থনৈতিক উন্নতির লক্ষ্য কমিয়ে দিয়েছে। আগে তারা প্রবৃদ্ধির একটি নির্দিষ্ট বা নিশ্চিত সংখ্যা নির্ধারণ করত, কিন্তু এখন তারা সেই ভাষার পরিবর্তন ঘটিয়ে ‘প্রায়’ বা ‘কাছাকাছি’ শব্দগুলো ব্যবহার করছে। এই পরিবর্তন থেকেই বোঝা যাচ্ছে, দেশটির সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এখন কতটা অনিশ্চিত ও চ্যালেঞ্জিং।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক