মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ কি ‘জ্বালানি যুদ্ধে’ রূপ নিচ্ছে?
মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়া যুদ্ধে এ সপ্তাহে জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর হামলা তেল ও গ্যাসের দামকে আকাশচুম্বী করেছে। বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে, এই ঘটনাগুলো বর্তমান সংঘাতকে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘জ্বালানি যুদ্ধে’ রূপান্তর করার আশঙ্কা জাগিয়ে তুলছে, যার প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত ভয়াবহ হতে পারে। খবর বার্তা সংস্থা এএফপির।
কী ঘটেছে?
ইরানের সাউথ পার্স গ্যাস ফিল্ডে ইসরায়েলি হামলার পর তেহরান প্রতিশোধ হিসেবে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে আঘাত হানার শপথ নেয়। বৃহস্পতিবার তারা বিশ্বের বৃহত্তম এলএনজি কেন্দ্র কাতারের রাস লাফান-এ হামলা চালায়। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কাতার এনার্জি জানিয়েছে, দুই দফা ইরানি হামলায় বেশ কিছু এলএনজি স্থাপনায় বিশাল অগ্নিকাণ্ডে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
এছাড়া সৌদি আরবের লোহিত সাগরীয় শোধনাগার (যা হরমুজ প্রণালি এড়ানোর পাইপলাইনের শেষ প্রান্তে অবস্থিত) এবং কুয়েতের দুটি তেল শোধনাগারেও হামলা চালানো হয়েছে।
মূল উদ্বেগগুলো কী?
ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে, যে পথ দিয়ে যুদ্ধের আগে বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ অপরিশোধিত তেল ও এলএনজি পরিবাহিত হতো। এতে জ্বালানির দাম দ্রুত বাড়লেও বিশ্লেষকরা এটিকে মূলত একটি 'পরিবহন সমস্যা' হিসেবে দেখছিলেন, যা যুদ্ধ থামলে দ্রুত সংশোধন করা সম্ভব।
কিন্তু বর্তমান হামলাগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, সংঘাত এখন জ্বালানি যুদ্ধের দিকে মোড় নিচ্ছে। অবকাঠামো ধ্বংস হওয়ার অর্থ হলো একটি দীর্ঘমেয়াদী সরবরাহ সংকট, যা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অনেক বেশি ক্ষতিকর।
এ প্রসঙ্গে গ্লোবাল রিস্ক ম্যানেজমেন্টের প্রধান বিশ্লেষক আর্ন লোহম্যান রাসমুসেন বলেন, যুদ্ধ এখন পরিষ্কারভাবে এমন এক পর্যায়ে প্রবেশ করেছে যেখানে সরাসরি জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। এটি পরিস্থিতির নতুন অবনতি এবং আগামী দিনগুলোতে জ্বালানির দাম আরও বাড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সিতে জেস্টিন প্রাইভেট ব্যাংকের ইনভেস্টমেন্ট স্ট্র্যাটেজি প্রধান জন প্লাসার্ড এই হামলাগুলোকে ‘পুরোদস্তুর জ্বালানি যুদ্ধের দিকে ধেয়ে যাওয়া’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
ফলাফল কী?
সাম্প্রতিক হামলার প্রভাব বিশ্ব জ্বালানি বাজারে তাৎক্ষণিকভাবে অনুভূত হয়েছে। ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম এক পর্যায়ে ১০ শতাংশের বেশি বেড়ে ব্যারেল প্রতি ১১৯ ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছিল।
ইউরোপীয় গ্যাসের দাম ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত লাফিয়ে বেড়ে বর্তমানে প্রতি মেগাওয়াট ঘণ্টা ৭০ ইউরোতে (২৮ শতাংশ বৃদ্ধি) স্থিতিশীল হয়েছে।
এর ফলে বিদ্যুতের দামও বাড়বে, কারণ ইউরোপে বিদ্যুতের দাম মূলত গ্যাসের দামের ওপর নির্ভর করে।
উড ম্যাকেঞ্জি-র এলএনজি স্ট্র্যাটেজি প্রধান ক্রিস্টি ক্রেমার বলেন, বাজার আশা করেছিল এই বিঘ্ন স্বল্পমেয়াদী হবে এবং ২০২৬ সালের মাঝামাঝি নাগাদ সরবরাহ আগের অবস্থায় ফিরবে। কিন্তু সেই সম্ভাবনা এখন ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছে।
সরবরাহ বিপর্যয়
রিস্টাড এনার্জি-র বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেছেন, ইরানের হামলাগুলোতে এমন সব স্থাপনাকে লক্ষ্য করা করেছে যা বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত এলএনজি বাণিজ্যের ২০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। তারা সতর্ক করেছেন, এই হামলা ইউরোপ, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং চীনে দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির অধীনে থাকা এলএনজি সরবরাহকে হুমকির মুখে ফেলবে।
এ বিষয়ে এনার্জি ফ্লাক্স-এর সেব কেনেডি বলেন, কাতারের এলএনজি সরবরাহ এই বছর যুদ্ধের আগের পর্যায়ে ফিরে যাবে—এমন চিন্তা এখন অলীক কল্পনা মাত্র। তিনি আরও বলেন, কাতারকে বিশ্ব এলএনজি সরবরাহের মূল ভিত্তি হিসেবে গড়ে তোলার যে ভূ-রাজনৈতিক কাঠামো ছিল, তা এখন চোখের সামনেই ভেঙে পড়ছে।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক