ইরানি ড্রোন নাকি মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র, বাহরাইনে বিস্ফোরণ কিসে?
ইরান যুদ্ধের ১০ দিনের মাথায় (৯ মার্চ) যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশ বাহরাইনে একটি শক্তিশালী বিস্ফোরণ ঘটে, যাতে বহু বেসামরিক লোক আহত হয় এবং বেশকিছু ঘরবাড়ি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের পর্যালোচিত একাডেমিক গবেষকদের একটি বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ভোররাতের ওই বিস্ফোরণটি সম্ভবত একটি মার্কিন-পরিচালিত ‘প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যাটারি’ থেকে ছোড়া ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের কারণে ঘটেছিল।
পাল্টাপাল্টি দাবি
গত ৯ মার্চের ওই বিস্ফোরণের জন্য বাহরাইন এবং ওয়াশিংটন উভয়ই ইরানকে দায়ী করেছিল। বাহরাইন জানিয়েছিল, এই হামলায় শিশুসহ ৩২ জন আহত হয়েছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ জানিয়েছিল, একটি ইরানি ড্রোন বাহরাইনের আবাসিক এলাকায় আঘাত হেনেছে।
তবে গতকাল শনিবার (২১ মার্চ) রয়টার্সের প্রশ্নের জবাবে বাহরাইন সরকার প্রথমবারের মতো স্বীকার করেছে, রাজধানী মানামার উপকণ্ঠে সিত্রা দ্বীপের মাহাজ্জা এলাকায় ওই বিস্ফোরণ একটি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের কারণে হয়েছিল। সরকারি মুখপাত্রের দাবি, প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রটি মাঝআকাশে একটি ইরানি ড্রোন সফলভাবে ধ্বংস করে এবং এতে প্রাণহানি রক্ষা পায়।
তবে ওই রাতে মাহাজ্জার কাছেই একটি তেল শোধনাগারে হামলা হয়েছিল, যার প্রমাণ ভিডিওতে পাওয়া গেলেও ড্রোন আসার কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ বাহরাইন বা ওয়াশিংটন দেয়নি।
গবেষকদের বিশ্লেষণ
মিডলবারি ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের গবেষক স্যাম লেয়ার, মাইকেল ডুইটজম্যান এবং অধ্যাপক জেফরি লুইস বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট ইমেজ এবং উন্মুক্ত ভিডিও বিশ্লেষণ করে বেশ উচ্চ মাত্রার আত্মবিশ্বাসের সাথে জানিয়েছেন, ক্ষেপণাস্ত্রটি সম্ভবত মাহাজ্জা এলাকা থেকে ৭ কিমি দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত একটি মার্কিন প্যাট্রিয়ট ব্যাটারি থেকে ছোড়া হয়েছিল।
স্যাটেলাইট চিত্র অনুযায়ী, রিফা নামক স্থানে থাকা এই ব্যাটারিটি অন্তত ২০০৯ সাল থেকে সেখানে রয়েছে। বাহরাইন নিজস্ব প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থা পরিচালনা শুরু করেছে ২০২৪ সাল থেকে।
গবেষকদের মতে, ক্ষেপণাস্ত্রটি সম্ভবত মাঝআকাশেই বিস্ফোরিত হয়েছে। যদি এটি ড্রোন ধ্বংস করতে গিয়েও বিস্ফোরিত হয়, তবে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এই ইন্টারসেপ্ট করার প্রচেষ্টা ছিল একধরনের ‘অসতর্কতা’, যা বেসামরিক জানমালের ক্ষতির ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে।
প্রযুক্তির লড়াই ও ঝুঁকি
সস্তা ড্রোনের বিরুদ্ধে অত্যন্ত দামী এবং উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার এই যুদ্ধের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। গবেষকরা বলছেন, প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ এবং জ্বালানি থেকেই মাহাজ্জার চারটি রাস্তায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজিটাল ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ হানি ফরিদ ভিডিওটি বিশ্লেষণ করে জানিয়েছেন, এটি কৃত্রিমভাবে তৈরি বা ভুয়া হওয়ার কোনো প্রমাণ নেই।
পেন্টাগনের নীরবতা
এ বিষয়ে পেন্টাগনের কাছে জানতে চাওয়া হলে তারা কোনো মন্তব্য করেনি। তবে হোয়াইট হাউসের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির সক্ষমতা গুঁড়িয়ে দিচ্ছে এবং মার্কিন বাহিনী কখনো বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্যবস্তু করে না। তবে, এর আগে ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধের প্রথম দিনেই ইরানে মেয়েদের একটি বিদ্যালয়ে মার্কিন হামলা হয়েছিল বলে রয়টার্স প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল।
ভৌগোলিক গুরুত্ব
পারস্য উপসাগরে মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তর বাহরাইনে অবস্থিত। হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বাহরাইন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বর্তমানে এই নৌপথটি (হরমুজ প্রণালি) ইরান প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়ায় বিশ্বজুড়ে তেলের বাজারে নজিরবিহীন অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক