দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা ট্রাম্পের, হরমুজ খুলতে সম্মত ইরান
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে পরিকল্পিত বিমান হামলা দুই সপ্তাহের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেছেন। হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার শর্তে এই সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে ইরান।
যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) সন্ধ্যায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প জানান, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের অনুরোধে তিনি হামলার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন। তবে তিনি শর্ত দেন- ইরানকে অবিলম্বে ও নিরাপদভাবে হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে হবে।
নির্ধারিত হামলার সময়সীমার মাত্র দেড় ঘণ্টা আগে এই ঘোষণা আসে। খবর আল জাজিরার।
এর কিছুক্ষণ পরই ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানান, একটি অস্থায়ী সমঝোতা হয়েছে। তিনি বলেন, ইরানের ওপর হামলা বন্ধ হলে আমাদের সশস্ত্র বাহিনীও প্রতিরক্ষামূলক অভিযান স্থগিত করবে। একই সঙ্গে তিনি নিশ্চিত করেন, দুই সপ্তাহের জন্য সমন্বয়ের মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক থাকবে।
ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলও ইঙ্গিত দিয়েছে, আলোচনায় অগ্রগতি হলে এই যুদ্ধবিরতির সময়সীমা আরও বাড়তে পারে। এ নিয়ে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে শিগগিরই নতুন করে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
ঘোষণার আগে পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ। ট্রাম্প সকালে এক পোস্টে সতর্ক করে বলেছিলেন, আজ রাতে একটি পুরো সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। এতে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
এর আগে তিনি ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র, সেতু ও অন্যান্য অবকাঠামো ধ্বংসের হুমকি দেন, যা আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের মতে যুদ্ধাপরাধের শামিল হতে পারে।
তবে সর্বশেষ ঘোষণায় ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে সামরিক লক্ষ্য অর্জন করেছে এবং ইরানের প্রস্তাবিত ১০ দফা পরিকল্পনা শান্তি আলোচনার ভিত্তি হতে পারে। আগামী দুই সপ্তাহে এই চুক্তির চূড়ান্ত রূপ দেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
আল জাজিরার সাংবাদিক ওসামা বিন জাভেদ বলেন, এই ঘোষণা মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বজুড়ে স্বস্তি বয়ে আনবে, কারণ সম্ভাব্য হামলার বিকল্প ছিল ভয়াবহ।
তবে তেহরানে এখনও কিছুটা অনিশ্চয়তা রয়েছে- এই যুদ্ধবিরতি পুরো সংঘাত থামাবে, নাকি শুধু বড় ধরনের হামলা স্থগিত করবে, তা স্পষ্ট নয় বলে জানান সাংবাদিক মোহাম্মদ ভাল।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ অভিযানের মাধ্যমে যুদ্ধ শুরু হয়। ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দাবি করেন, ইরানকে আঞ্চলিক হুমকি থেকে সরাতেই এই অভিযান।
তবে আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা এটিকে উসকানিহীন হামলা হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। এখন পর্যন্ত ইরানে প্রায় ২০৭৬ জন নিহত হয়েছেন। উপসাগরীয় অঞ্চলে নিহত হয়েছেন আরও ২৮ জন। যুক্তরাষ্ট্রের ১৩ জন সেনা সদস্য এবং ইসরায়েলে ২৬ জন নিহত হয়েছেন।
যুদ্ধ শুরুর পর ইরান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল সীমিত করে দেয়, যার মাধ্যমে বিশ্বে প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস পরিবাহিত হয়। ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে যায় এবং যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প প্রশাসন সমালোচনার মুখে পড়ে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে- ইসরায়েল এই সমঝোতা মেনে চলবে কি না।
আল জাজিরার সাংবাদিক মাইক হানা বলেন, ইসরায়েল সাধারণত যুক্তরাষ্ট্রের নীতির অনুসরণ করে, তবে অনেকের মতে যুক্তরাষ্ট্র এই যুদ্ধে জড়িয়েছে ইসরায়েলের প্রভাবেই।
কুইন্সি ইনস্টিটিউটের ভাইস প্রেসিডেন্ট ত্রিতা পারসি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র চাইলে ইসরায়েলের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে পারে, কিন্তু তা রাজনৈতিকভাবে ব্যয়বহুল হতে পারে।
পারসি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সক্রিয় সমর্থন ছাড়া ইসরায়েলের পক্ষে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া কঠিন। তাই তারা একা এই ঝুঁকি নিতে চাইবে না।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক