মার্কিন অবরোধ ইরানের কতটা ক্ষতি করবে, পরিত্রাণের উপায় কী?
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ইরানের অর্থনীতিকে চরম চাপের মুখে ফেলে যুদ্ধ শেষ করার শর্ত মেনে নিতে তেহরানকে বাধ্য করার কৌশল নিয়েছে। এরই অংশ হিসেবে সোমবার (১৩ এপ্রিল) স্থানীয় সময় দুপুর ২টা থেকে ইরানের বন্দরগুলোতে মার্কিন নৌ অবরোধ কার্যকর হয়েছে। ইরান এই পদক্ষেপকে ‘অবৈধ কাজ’ ও ‘জলদস্যুতার সমতুল্য’ বলে অভিহিত করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান নিষেধাজ্ঞায় অভ্যস্ত হলেও এই অবরোধ দেশটির অর্থনীতিতে বড় ধরনের ক্ষত তৈরি করতে পারে।
ইরান মূলত তার বন্দরগুলোর মাধ্যমে তেল ও গ্যাস রপ্তানি করে। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তেহরান হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা দিলে তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়।
অবাক করা তথ্য হলো, যুদ্ধের আগের তুলনায় গত এক মাসে ইরানের তেল রপ্তানি আয় ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ফেব্রুয়ারির শুরুতে যেখানে মাসিক আয় ছিল ৩ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলার, সেখানে গত এক মাসে (১৫ মার্চ থেকে ১৪ এপ্রিল) ইরান আয় করেছে ৪ দশমিক ৯৭ বিলিয়ন ডলার।
কেপলার-এর তথ্যমতে, ইরান মার্চ মাসে দৈনিক ১ দশমিক ৮৪ মিলিয়ন ব্যারেল ও এপ্রিলের শুরুতে ১ দশমিক ৭১ মিলিয়ন ব্যারেল তেল পাঠিয়েছে। গত এক মাসে মোট ৫৫ দশমিক ২২ মিলিয়ন ব্যারেল তেল রপ্তানি হয়েছে, যার প্রতি ব্যারেলের দাম ৯০ থেকে ১০০ ডলারের নিচে নামেনি।
মার্কিন অবরোধের ফলে এই রপ্তানি ক্ষমতা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অধ্যাপক মোহাম্মদ এলমাসরি বলেন, ইরান এখন আর আগের মতো তেল রপ্তানি করতে পারবে না ও হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী অ-ইরানি জাহাজ থেকে ‘টোল’ আদায়ের সুযোগও হারাবে।
সামুদ্রিক গোয়েন্দা সংস্থা উইন্ডওয়ার্ড-এর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সমুদ্রে থাকা ইরানের মোট তেলের পরিমাণ প্রায় ১৫৭ দশমিক ৭ মিলিয়ন ব্যারেল। এর মধ্যে ৯৭ দশমিক ৬ শতাংশই চীনের জন্য নির্ধারিত। অবরোধের কারণে এই বিশাল পরিমাণ তেল সরবরাহ সরাসরি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। তবে বিশ্লেষক ফ্রেডেরিক স্নাইডার মনে করেন, চীন এই অবরোধের কাছে নতি স্বীকার করবে না এবং মার্কিন নৌবাহিনীও চীনা জাহাজগুলো সরাসরি ডুবিয়ে দেওয়ার ঝুঁকি নেবে না।
অন্যান্য পণ্যের বাণিজ্যে প্রভাব
তেল ছাড়াও পেট্রোকেমিক্যাল, প্লাস্টিক ও কৃষি পণ্য রপ্তানি এবং শিল্প যন্ত্রপাতি ও খাদ্য আমদানির ক্ষেত্রেও ইরান সংকটে পড়বে।
তেহরান টাইমসের তথ্যমতে, ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত ইরানের তেল-বহির্ভূত বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ৯৪ বিলিয়ন ডলার।
হাইড্রোকার্বন-বহির্ভূত বাণিজ্য ব্যাহত হলে দেশে পণ্যের তীব্র ঘাটতি দেখা দেবে ও সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে, যা ইতোমধ্যেই চাপে থাকা অর্থনীতিতে অভ্যন্তরীণ সংকট বাড়াবে।
নৌ-অবরোধ এড়াতে ইরানের সামনে একটি কার্যকর বিকল্প হয়ে উঠতে পারে চীন-ইরান সরাসরি রেলপথ। ২০১৬ সাল থেকে চালু হওয়া এই রেল সংযোগটি কাজাখস্তান, উজবেকিস্তান ও তুর্কমেনিস্তানের মধ্য দিয়ে পণ্য পরিবহণে সক্ষম, যা পশ্চিমা শক্তির নৌ-বাধার ঝুঁকি অনেকাংশে কমিয়ে দেয়। মূলত এটি তথাকথিত ‘ভূতুড়ে জাহাজ’ বা শনাক্তকরণ ব্যবস্থা বন্ধ করে পণ্য পরিবহণকারী জাহাজের ওপর তেহরানের নির্ভরতা কমাতে সাহায্য করে। তবে এর পেছনে বড় ধরনের লজিস্টিক চ্যালেঞ্জও রয়েছে; রেলপথে বিপুল পরিমাণ হাইড্রোকার্বন বা তেল পরিবহণ করা অত্যন্ত কঠিন ও এখন পর্যন্ত এই পথে বড় পরিসরে তেল পরিবহণের কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
ফ্রেডেরিক স্নাইডার বলেন, প্রশ্ন হলো এই বর্ধিত দুর্ভোগ ইরানকে পরাজয় স্বীকার করতে বাধ্য করবে কি না। তবে তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেছেন, এই অবরোধ পুরোপুরি কার্যকর হবে বা খুব বেশিদিন টিকবে। বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত অস্থিতিশীল, যা হয় একটি যুদ্ধবিরতির দিকে মোড় নিতে পারে, নতুবা বোমাবর্ষণ ও পুনরায় সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু হওয়ার মাধ্যমে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হতে পারে।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক