পশ্চিমবঙ্গে কেন ভোটাধিকার হারাচ্ছে লাখো নাগরিক?
গত ৫০ বছর ধরে ভারতের স্থানীয় নির্বাচন থেকে শুরু করে রাজ্যসভা বা জাতীয় নির্বাচন- সব নির্বাচনেই ভোট দিয়ে আসছিলেন ৭৩ বছর বয়সী নবীজান মন্ডল। কিন্তু হঠাৎ করেই তিনি দেখছেন ভারতের নির্বাচন কমিশনের (ইসিআই) প্রকাশিত ভোটার তালিকায় তার নাম নেই। ঘটনাটি ঘটেছে তার নিজ রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে। রাজ্যটিতে আগামী ২৩ এবং ২৯ এপ্রিল দুই দফায় বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এবং এই নির্বাচনের ভোট গণনা হবে ৪ মে। খবর আলজাজিরার।
নির্বাচনের আগে এই মাসে দেশটির নির্বাচন কমিশন ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (এসআইআর) বা বিশেষ নিবিড় সংশোধনীর মাধ্যমে ভোটার তালিকা সংশোধন করেছে। এটি একটি বিতর্কিত প্রক্রিয়া যা ভারতের নির্বাচনি কর্তৃপক্ষ এ পর্যন্ত ডজনেরও বেশি রাজ্য এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে কার্যকর করেছে।
নবীজানের স্বামী, তিন ছেলে, এক মেয়ে এবং তাদের জীবনসঙ্গীরা সবাই চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় স্থান পেয়েছেন। কিন্তু তিনি পাননি। এর কারণ, দীর্ঘ সময় ধরে নবীজান এবং তার পরিবারের সদস্যরা লক্ষ্য করেননি যে, তার ভোটার কার্ডে ‘নবীজান’ (তার ডাকনাম) ব্যবহার করা হয়েছে, কিন্তু বায়োমেট্রিক আইডি (আধার কার্ড) এবং রেশন কার্ডসহ অন্যান্য সরকারি নথিতে তার নাম ‘নবীরুল’।
এই মাসের শুরুতে ‘এসআইআর’ প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর পশ্চিমবঙ্গে ভোটাধিকার হারানো ৯০ লাখেরও বেশি মানুষের মধ্যে নবীজান একজন। এই সংখ্যাটি রাজ্যের মোট ৭ কোটি ৬০ লাখ ভোটারের প্রায় ১২ শতাংশ। এই ৯০ লাখ ভোটারের মধ্যে প্রায় ৬০ লাখকে অনুপস্থিত বা মৃত ঘোষণা করা হয়েছে। বাকি ৩০ লাখ ভোটার ততক্ষণ পর্যন্ত ভোট দিতে পারবেন না, যতক্ষণ না বিশেষ ট্রাইব্যুনাল তাদের মামলার শুনানি শেষ করছে।
তবে নির্বাচনের আগে এই বিপুল সংখ্যক মামলার শুনানি শেষ করা ট্রাইব্যুনালগুলোর পক্ষে প্রায় অসম্ভব। এছাড়া, সাধারণ মানুষের জন্য ট্রাইব্যুনালে যাওয়া এবং ভোটাধিকার প্রমাণের প্রয়োজনীয় নথিপত্র জোগাড় করাও অত্যন্ত ঝামেলাপূর্ণ কাজ। চলতি সপ্তাহের শুরুতে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, যাদের মামলা ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন, তাদের এপ্রিলের নির্বাচনে ভোট দেওয়ার অনুমতি দেওয়া সম্ভব নয়। তবে আদালত বলেছে, তারা চাইলে নির্বাচনের আগে নির্বাচন কমিশনকে সম্পূরক ভোটার তালিকা প্রকাশের অনুমতি দিতে পারে।
পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার গোবিন্দপুর গ্রামের বাসিন্দা নবীজান এ প্রসঙ্গে আলজাজিরাকে বলেন, ‘এবার আমার পুরো পরিবার ভোট দেবে, কিন্তু আমি পারব না। আমি এসব খুব একটা বুঝি না। জানতাম না যে নামে অমিল থাকলে আমার ভোট দেওয়া বন্ধ হয়ে যাবে।’
‘আমি খুব কষ্টে আছি’
ভারতে ২০১১ সালের সর্বশেষ আদমশুমারি অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে প্রায় আড়াই কোটি মুসলিম বসবাস করেন, যা রাজ্যের ১০ কোটি ৬০ লাখ জনসংখ্যার প্রায় ২৭ শতাংশ। উত্তরপ্রদেশের পর ভারতের রাজ্যগুলোর মধ্যে এই রাজ্যেই মুসলিম সম্প্রদায়ের দ্বিতীয় বৃহত্তম জনসংখ্যা রয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গ এমন একটি রাজ্য যেখানে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) কখনো জয়ী হতে পারেনি। এ রাজ্যে ক্ষমতাসীন দল তৃণমূল কংগ্রেস, যার নেতৃত্বে রয়েছেন নরেন্দ্র মোদির কড়া সমালোচক ৭১ বছর বয়সী লড়াকু নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দলটি ২০১১ সাল থেকে এই রাজ্য শাসন করছে। সে সময় তারা তৎকালীন বামপন্থীদের টানা ৩৪ বছরের শাসনের রেকর্ড ভেঙে ক্ষমতায় এসেছিল।
পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে, এই 'এসআইআর' প্রক্রিয়ায় মুসলিমরা আনুপাতিকভাবে অনেক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে যেসব জেলায় তাদের জনসংখ্যা বেশি এবং যারা নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে, সেখানেই বেশি নাম কাটা গেছে। এর মধ্যে মুর্শিদাবাদে ৪ লাখ ৬০ হাজার, উত্তর ২৪ পরগনায় ৩ লাখ ৩০ হাজার এবং মালদায় ২ লাখ ৪০ হাজার ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
আলজাজিরা উত্তর ২৪ পরগনার গোবিন্দপুর, গোবরা এবং বালকি গ্রামের প্রায় এক ডজন মুসলিম পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছে। তারা জানিয়েছেন, নথিপত্র ঠিক থাকা সত্ত্বেও অনেকের নাম ভোটার তালিকা থেকে মুছে ফেলা হয়েছে। আবার অনেকে তাদের বসবাসের প্রমাণ, বিয়ের পর পদবি পরিবর্তন বা বাবা-মায়ের পুনর্বিবাহের প্রমাণ, নামের বানানে অসঙ্গতি কিংবা অন্য রাজ্যে স্থানান্তরের প্রমাণ জোগাড় করতে হিমশিম খাচ্ছেন। এমনকি অনেকের নাম ২০০২ সালে প্রকাশিত সর্বশেষ এসআইআর তালিকায় থাকার কারণেও বাদ পড়েছে।
নবীজানের মতো মুর্শিদাবাদের সাগরপাড়া গ্রামের ৪৯ বছর বয়সী শহিদুল ইসলামও আগের নির্বাচনগুলোতে ভোট দিয়েছিলেন। কিন্তু এখন তিনি আর ভোটার নন।
শহিদুল টেলিফোনে আলজাজিরাকে বলেন, ‘আমি খুব কষ্টে আছি। আমি কার কাছে যাব? আমি কখনো ভাবিনি তালিকা থেকে আমার নাম বাদ যাবে। তবে এখন আমি নাম অন্তর্ভুক্ত করার দিকেই মনোযোগ দিতে চাই। টাকা এবং সময় নষ্ট হলেও আমাকে ভবিষ্যতের কথা ভাবতে হবে।’
ভারতের নির্বাচন কমিশনের দাবি, এসআইআর প্রক্রিয়ার লক্ষ্য হলো ভুয়া বা মৃত ভোটারদের বাদ দেওয়া এবং বাদ পড়া প্রকৃত ভোটারদের অন্তর্ভুক্ত করা।
তবে এই প্রক্রিয়াটি ব্যাপক বিতর্ক এবং আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। বিরোধী দল এবং মুসলিম সংগঠনগুলো নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে একটি ‘পরিকল্পিত তৎপরতার’ অভিযোগ এনেছে। তাদের দাবি, যাদের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভারতীয় জনতা পার্টিকে (বিজেপি) ভোট দেওয়ার সম্ভাবনা কম, তাদেরই ভোটার তালিকা থেকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে মুসলিমদের লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে, যারা ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পর থেকে বিজেপির হিন্দু আধিপত্যবাদী প্রচার ও নীতির প্রধান শিকারে পরিণত হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গ বিজেপি নেতা বিমল শঙ্কর নন্দ আলজাজিরাকে বলেন যে, কোনো যোগ্য ভারতীয় ভোটার যেন তালিকা থেকে বাদ না পড়েন, তেমনি কোনো অযোগ্য ভোটারও তালিকায় থাকা উচিত নয়। তিনি তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে মৃত এবং স্থানান্তরিত ভোটারদের নাম তালিকায় রাখার অভিযোগ তোলেন।
বিমল শঙ্কর আরও বলেন, ‘এটিও সত্য যে বাংলাদেশের সাথে থাকা সীমান্ত এলাকার জনতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য একটি সুপরিকল্পিত উপায়ে পরিবর্তিত হচ্ছে। এটি এখন সবার জানা এবং টিভি চ্যানেলগুলোও দেখিয়েছে যে, এসআইআর প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর অ-ভারতীয় নাগরিকরা সীমান্ত এলাকা দিয়ে রাজ্য ছেড়ে চলে যাচ্ছে।’
দ্রুত 'এসআইআর' সম্পন্ন করার পেছনে 'গোপন উদ্দেশ্য'
২০১৪ সাল থেকে ভারতের মুসলিমরা মূলত সেই রাজনৈতিক দল বা জোটকেই ভোট দিয়ে আসছে যারা ডানপন্থী বিজেপিকে পরাজিত করতে সক্ষম। পশ্চিমবঙ্গে সেই দলটি হলো তৃণমূল কংগ্রেস। একারণেই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গত ফেব্রুয়ারিতে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। তিনি অভিযোগ করেন যে, গত অক্টোবরে শুরু হওয়া 'এসআইআর' প্রক্রিয়ায় নির্বাচন কমিশন বিজেপির প্রতি পক্ষপাতিত্ব করছে।
এই সপ্তাহে একটি নির্বাচনি জনসভায় মমতা বন্দ্যোপাধায় বলেন, ‘বিজেপিকে সুবিধা দেওয়ার জন্য পশ্চিমবঙ্গে বেছে বেছে এসআইআর প্রক্রিয়া প্রয়োগ করা হয়েছে। তারা গণতান্ত্রিকভাবে লড়াই করে জেতার সাহস রাখে না, তাই জালিয়াতির মাধ্যমে জোর করে ভোট দখলের চক্রান্ত করছে।’
বিজেপির দাবি, এই প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্য ছিল পশ্চিমবঙ্গ থেকে লাখ লাখ ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ শনাক্ত করে বাদ দেওয়া। তারা প্রায়ই ‘বাংলাদেশি’ এবং ‘রোহিঙ্গা’ শব্দ দুটিকে সমার্থক হিসেবে ব্যবহার করে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের ২ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। বাংলাদেশে বর্তমানে ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীর বাস, যাদের বেশিরভাগই ২০১৭ সালে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর জাতিগত নিধন অভিযান থেকে বাঁচতে পালিয়ে এসেছিল।
বিজেপি দীর্ঘদিন ধরে হিন্দু নাগরিকদের কাছ থেকে তাদের সমর্থন বাড়াতে নির্বাচনের আগে বাংলাদেশি ‘অনুপ্রবেশকারী’ বা ‘অবৈধ অভিবাসী’ শব্দগুলো ব্যবহার করে আসছে। সম্প্রতি আসামের বিধানসভা নির্বাচনেও তারা এই কৌশল ব্যবহার করেছে। আসাম ও পশ্চিমবঙ্গসহ অন্যান্য রাজ্যের নির্বাচনের ফলাফল আগামী ৪ মে প্রকাশিত হবে।
তবে কলকাতার স্বতন্ত্র গবেষণা প্রতিষ্ঠান 'সাবার ইনস্টিটিউট'-এর সাবির আহমেদ আলজাজিরাকে বলেন, ‘ভোটার তালিকা সংশোধন একটি রুটিন কাজ এবং সাধারণত এটি এক বা দুই বছর ধরে করা হয়। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যের ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত তড়িঘড়ি করে সম্পন্ন করা হয়েছে।’
সাবির আহমেদ বলেন, ‘এত তাড়াহুড়ো করে এই কাজ করার পেছনে কোনো উদ্দেশ্য থাকতে পারে বলে মনে হয়। স্থানীয় কোনো জ্ঞান নেই এমন সব মাইক্রো-অবজারভারদের অন্য রাজ্য থেকে নিয়ে আসা হয়েছিল... নির্বাচন কমিশনের এই প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব ছিল এবং মাঝরাতে তালিকাগুলো প্রকাশ করা হয়েছিল।’
সাবার ইনস্টিটিউট নন্দীগ্রাম এবং ভবানীপুর—এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ আসনের ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার বিষয়টি বিশ্লেষণ করেছে। এই দুটি আসনেই এবার বিজেপির বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ভবানীপুর আসনে তার প্রতিদ্বন্দ্বী খোদ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নন্দীগ্রামে মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ২৫ শতাংশ হলেও, ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া নামের ৯৫ শতাংশই মুসলিম। একইভাবে ভবানীপুরে ২০ শতাংশ মুসলিম জনসংখ্যা থাকলেও, বাদ পড়া ভোটারদের ৪০ শতাংশই মুসলিম।
সাবির আহমেদ আরও জানান, প্রাথমিক ফলাফলে দেখা গেছে, মুসলিমরাই এই প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বেশি লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। প্রথমে ৫০ লাখের বেশি মানুষকে ‘এএসডিডি’ (অনুপস্থিত, স্থানান্তরিত, মৃত বা ডুপ্লিকেট) তালিকায় রাখা হয়। এরপর তারা এআই (কৃত্রিম বৃদ্ধিমত্তা) টুল ব্যবহার শুরু করে এবং মুসলিম নামগুলোর ক্ষেত্রে উর্দু বা আরবি শব্দ থেকে বাংলা বা ইংরেজিতে অনুবাদের সময় বড় ধরনের ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সি’ বা যৌক্তিক অসঙ্গতি খুঁজে পায়।
সাবির আহমেদ বলেন, ‘আমাদের গবেষণায় দেখা গেছে, চিহ্নিত জনসংখ্যার মধ্যে মুসলিমদের নামই আনুপাতিকভাবে সবচেয়ে বেশি মুছে ফেলা হয়েছে।’
‘অল ইন্ডিয়া ইমাম অ্যাসোসিয়েশন’-এর পশ্চিমবঙ্গ শাখার প্রধান মোহাম্মদ বাকি বিল্লাহ মোল্লা বলেন, তাদের সংগঠন পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে হেল্পলাইন চালু করেছে যাতে যাদের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে তারা ট্রাইব্যুনালে যাওয়ার ক্ষেত্রে সাহায্য পেতে পারেন।
বাকি বিল্লাহ বলেন, ‘যেকোনো যোগ্য ভারতীয় ভোটারের বিরুদ্ধে কোনো চক্রান্ত হওয়া উচিত নয়, সে মুসলিম হোক বা হিন্দু বা অন্য কোনো সম্প্রদায়। যারা ভোট দিতে পারবেন না, সেই দায়ভার কে নেবে?’
আল জাজিরা এই বিষয়ে পশ্চিমবঙ্গের দুজন ঊর্ধ্বতন নির্বাচন কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলেও তারা কোনো সাড়া দেননি।
নারী ভোটারদের ওপর ‘অতিরিক্ত বোঝা’
বেঙ্গালুরুর ‘ন্যাশনাল ল স্কুল অফ ইন্ডিয়া ইউনিভার্সিটি’-র আইন, দারিদ্র্য ও উন্নয়ন বিষয়ের শিক্ষক স্বাতী নারায়ণ আলজাজিরাকে বলেন, নারী এবং দরিদ্র মানুষেরা ভোটাধিকার হারানোর ক্ষেত্রে অসম ঝুঁকির মুখে রয়েছেন। কারণ নাগরিক অধিকার প্রমাণের জন্য প্রয়োজনীয় নথিপত্র প্রায়ই তাদের কাছে থাকে না।
স্বাতী নারায়ণ বলেন, ‘নারীদের ক্ষেত্রে, বিশেষ করে পিতৃতান্ত্রিক সমাজে বিয়ের পর তাদের বাসস্থান পরিবর্তন করতে হয়। পশ্চিমবঙ্গে ডাকনাম ব্যবহারের একটি সাধারণ প্রবণতা রয়েছে, যা অনেক সময় সরকারি নথিতেও ঢুকে পড়ে। বেশিরভাগ নারী, বিশেষ করে মুসলিম নারীদের বিয়ের আগে এবং পরে আলাদা পদবি দেওয়া হয়। এছাড়া ইংরেজি অনুবাদের ক্ষেত্রেও নামের বানানে ভুল হতে পারে। আমরা এখন যা দেখছি, তা সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে।’
গোবিন্দপুরের বাসিন্দা ৩১ বছর বয়সী জেসমিনা খাতুন আলজাজিরাকে জানান, তার প্রতিটি নথিপত্র ঠিক ছিল এবং নামের বানানও সঠিক ছিল। তার বাবা এবং দাদার নাম ২০০২ সালের তালিকাতেও ছিল। শুধু একটি সামান্য অমিল ছিল, তা হলো- জেসমিনার স্কুল সার্টিফিকেটে তার বাবার নাম ‘গফফার মন্ডল’ এবং অন্যান্য নথিতে ‘গাফফার মন্ডল’ হিসেবে লেখা ছিল। জেসমিনার বাবার নাম নতুন তালিকায় স্থান পেলেও, জেসমিনার নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
ভারতের তিনটি নির্বাচনে ভোট দেওয়া জেসমিনা বলেন, ‘আমি জানি না এখন সামনে কী হবে। আমার সব কাগজ ঠিক থাকা সত্ত্বেও আমি আজকাল খুব দুশ্চিন্তায় থাকি। তবে আমার অন্য কোনো আত্মীয়কে এই সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়নি।’
তত্ত্বাবধায়ক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক যোগেন্দ্র যাদব আলজাজিরাকে বলেন, এই ‘এসআইআর’ প্রক্রিয়া নারী ভোটারদের ওপর এক ‘অতিরিক্ত বোঝা’ চাপিয়ে দিচ্ছে।
যোগেন্দ্র যাদব বলেন, ‘পুরুষদের নথিপত্রের হিসাব দিতে হয় তারা যেখানে বসবাস করেন সেখানকার পরিবারের ভিত্তিতে। কিন্তু নারীদের নথিপত্র জোগাড় করতে হয় তারা যেখানে থাকেন না সেখান থেকে—অর্থাৎ তাদের ‘মাইকা’ বা বাবার বাড়ি থেকে। নথিপত্রের এই বাড়তি ঝক্কির কারণেই বিপুল সংখ্যক নারীর নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে।’
যোগেন্দ্র যাদব আরও বলেন, ‘ভারতের অনেক অঞ্চলে বিয়ের পর নারীদের প্রথম নাম পরিবর্তন করার একটি সাধারণ নিয়ম রয়েছে। এখন আইনের চোখে এটিকে অপরাধ বা জালিয়াতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই বিষয়টির প্রতি সংবেদনশীলতার অভাবেই নারী ভোটারদের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় গণ-ভোটাধিকার হরণের ঘটনা ঘটছে।’
গত বছর বিহারের ‘এসআইআর’ প্রক্রিয়াকে সুপ্রিমে কোর্টে চ্যালেঞ্জ করা যোগেন্দ্র যাদব বলেন, সমস্যাটি ভারত সরকারের। সরকার নিজের ব্যর্থতাকে জনগণের অপরাধ হিসেবে চালিয়ে দিতে ক্ষমতার অপব্যবহার করছে।
যোগেন্দ্র যাদব আরও বলেন, ‘সমস্যাটি রাষ্ট্রের। রাষ্ট্র মানুষের কাছে এমন নথি দাবি করছে যা সে নিজেই কখনো দেয়নি। হঠাৎ করেই আপনি কোনো বিশেষ নথিপত্র চাইছেন; এমন একজন মানুষের নামের বানান সব জায়গায় একই রকম হবে—এই প্রত্যাশা করা কঠিন যিনি হয়তো শিক্ষিত নন। আবার ধরা যাক তারা শিক্ষিত, কিন্তু নামগুলো তো তারা নিজেরা নথিবদ্ধ করেননি। সমস্যা হলো রাষ্ট্র নিজেই ভিন্ন ভিন্ন নথিতে বা রেজিস্টারে ভিন্ন ভিন্ন ফরম্যাটে নামগুলো লিখেছে।’
মুর্শিদাবাদের শহিদুল ইসলাম জানান, দুটি এসআইআর শুনানিতে অংশ নেওয়া এবং সব প্রয়োজনীয় নথিপত্র জমা দেওয়ার পরও তার নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। তিনি ক্ষোভের সাথে বলেন, ‘জানেন দুঃখের বিষয় কোনটি? আপনি যদি এই মাটি খুঁড়েন, তবে এখানে আমাদের নাড়ির সন্ধান পাবেন। আমি একজন মুসলিম... আমরা এখানেই ভোট দেব এবং আমরা এখানেই মরব।’

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক