চাবাহার বন্দর : ভারতের এক দশকের স্বপ্ন কি তবে শেষ?
ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধুত্বের সম্পর্ক আবারও এক কঠিন পরীক্ষার মুখে। দীর্ঘ এক দশক ধরে ইরানের চাবাহার বন্দরে ভারত যে বিপুল বিনিয়োগ করেছে, তা এখন স্থবির হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। গত রোববার (২৬ এপ্রিল) চাবাহার প্রকল্পের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া বিশেষ ছাড়ের মেয়াদ শেষ হয়েছে। ওয়াশিংটন এই ছাড় আর নবায়ন করার কোনো লক্ষণ না দেখানোয় প্রকল্পটি এখন গভীর সংকটে।
কেন চাবাহার বন্দর ভারতের জন্য এত গুরুত্বপূর্ণ?
দক্ষিণ-পূর্ব ইরানে অবস্থিত এই বন্দরটি ভারতের জন্য কেবল একটি বাণিজ্যিক কেন্দ্র নয়, বরং এটি ছিল পাকিস্তানের স্থলপথ এড়িয়ে আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ায় পৌঁছানোর প্রধান পথ।
পাকিস্তানের গোয়াদর বন্দরে চীনের প্রভাব মোকাবিলায় চাবাহার ছিল ভারতের তুরুপের তাস।
সাত হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই আন্তর্জাতিক উত্তর-দক্ষিণ পরিবহন করিডোরের দক্ষিণ প্রান্ত হলো চাবাহার, যা সরাসরি রাশিয়াকে ভারতের সঙ্গে যুক্ত করার কথা।
ভারত এই বন্দরের ‘শহীদ বেহেশতি’ টার্মিনাল সাজাতে ১২০ মিলিয়ন (১২ কোটি) ডলার বিনিয়োগ করেছে ও উন্নয়নের জন্য ৫০০ মিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।
নিষেধাজ্ঞার গ্যাঁড়াকলে চাবাহার
ট্রাম্প প্রশাসনের ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতির কারণে ইরানের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা বলবৎ রয়েছে। তবে কৌশলগত কারণে ২০১৮ সালে চাবাহারকে এই নিষেধাজ্ঞার আওতামুক্ত রাখা হয়েছিল।
দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় এসে ট্রাম্প প্রশাসন ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ঘোষণা দেয় যে, তারা চাবাহারসহ সব ধরনের ছাড় প্রত্যাহার করছে।
ভারতের কূটনৈতিক তৎপরতায় এই ছাড়ের মেয়াদ চলতি বছরের ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছিল। কিন্তু ভারত শর্ত দিয়েছিল যে তারা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সেখান থেকে কার্যক্রম গুটিয়ে নেবে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ভারত এই প্রকল্পে ১২ কোটি ডলার পরিশোধ করলে দেশের ভেতরেই সমালোচনার মুখে পড়ে মোদী সরকার। বিরোধীদের অভিযোগ, মার্কিন চাপে ভারত জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন দিচ্ছে।
যা বলছে ভারত
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানিয়েছেন, তারা তেহরান ও ওয়াশিংটন উভয়ের সঙ্গেই আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতি বিষয়টিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
গত এক দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো এ বছর ভারত তার বার্ষিক বাজেটে চাবাহার প্রকল্পের জন্য কোনো অর্থ বরাদ্দ রাখেনি।
জানা গেছে, ভারত এই বন্দরের ব্যবস্থাপনা কোনো ইরানি সংস্থার হাতে তুলে দেওয়ার কথা ভাবছে, যাতে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবারও ফিরে আসা যায়।
আটলান্টিক কাউন্সিলের ফেলো মাইকেল কুগেলম্যানের মতে, চাবাহার বর্তমানে একটি ‘ক্ষতিগ্রস্ত সম্পদে’ পরিণত হয়েছে। ভারত যদি এই প্রকল্প নিয়ে এগোতে চায়, তবে তাকে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি নিতে হবে।
বিশ্লেষক আনোয়ার আলমের মতে, চাবাহার ধরে রাখার চেয়ে যদি ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুকে খুশি রাখা ভারতের কাছে বড় অগ্রাধিকার হয়, তবে এই প্রকল্প থেকে সরে আসাই হবে ভারতের একমাত্র পথ।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার এই বেড়াজালে ভারতের ‘চাবাহার স্বপ্ন’ শেষ পর্যন্ত টিকে থাকবে কি না, তা সময় বলে দেবে।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক