বিমান দুর্ঘটনার চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশের আগেই সংকটে এয়ার ইন্ডিয়া
ভারতের আহমেদাবাদে গত বছরের ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনার চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের আগেই গভীর সংকটে পড়েছে ভারতের জাতীয় বিমান সংস্থা এয়ার ইন্ডিয়া।
২০২৫ সালের ১২ জুন আহমেদাবাদ থেকে লন্ডনগামী এয়ার ইন্ডিয়ার ফ্লাইট এআই-১৭১ উড্ডয়নের কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই বিধ্বস্ত হয়। এতে ২৬০ জন নিহত হন। আগামী এক মাসের মধ্যে ভারতের এয়ারক্রাফট অ্যাক্সিডেন্ট ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো (এএআইবি) দুর্ঘটনার চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করতে পারে। খবর বিবিসির।
এই প্রতিবেদন ঘিরে বিশ্বজুড়ে অপেক্ষার মধ্যে এয়ার ইন্ডিয়াকে এখন একের পর এক নতুন সংকটের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
নেতৃত্ব সংকট, বাড়তে থাকা আর্থিক ক্ষতি, আকাশপথ বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সংকট- সব মিলিয়ে সংস্থাটির পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা এখন প্রশ্নের মুখে পড়েছে। পাশাপাশি সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা সংস্থাটির নিরাপত্তা ও পরিচালনাগত সক্ষমতা নিয়েও নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
গত মাসে এয়ার ইন্ডিয়ার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ক্যাম্পবেল উইলসন মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই পদত্যাগ করেন। স্থানীয় গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত অর্থবছরে সংস্থাটির ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াতে পারে ২৪০ কোটি ডলারে।
২০২২ সালে টাটা গ্রুপ সরকারের কাছ থেকে এয়ার ইন্ডিয়ার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই সংস্থাটি পুনর্গঠনের চেষ্টা চলছে। তবে বর্তমানে টাটা গ্রুপের সবচেয়ে বেশি লোকসানী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে এয়ার ইন্ডিয়া।
ভারতীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহে টাটা বোর্ডের বৈঠকে ব্যয় কমানোর বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা হয়েছে এবং কর্মীদের ‘কঠিন সময়ের’ জন্য প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে।
এদিকে এয়ার ইন্ডিয়ার ২৫ দশমিক ১ শতাংশ মালিকানাধীন সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের মুম্বাই সদর দপ্তরে আগমন নতুন জল্পনার জন্ম দিয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, প্রতিষ্ঠানটি এয়ার ইন্ডিয়ার পরিচালনায় আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন সময়ে উইলসনের পদত্যাগ বড় ধরনের নেতৃত্বশূন্যতা তৈরি করেছে, যখন সংস্থাটির সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল শক্ত নেতৃত্বের।
এয়ার ইন্ডিয়ার সাবেক নির্বাহী পরিচালক জিতেন্দ্র ভার্গব বলেন, বেসরকারিকরণের পর পাঁচ বছরের পুনর্গঠন পরিকল্পনা নেওয়া হলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে।
তার মতে, টাটা গ্রুপ এয়ার ইন্ডিয়ার পুরোনো সমস্যাগুলোর গভীরতা সঠিকভাবে বুঝতে পারেনি এবং দ্রুত কার্যকর টিম গঠনেও ব্যর্থ হয়েছে।
গত এক বছরে একের পর এক পরিচালনাগত ভুল ও নিরাপত্তা ত্রুটির কারণে সংস্থাটিকে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে।
চলতি বছরের মার্চে দিল্লি থেকে ভ্যাঙ্কুভারগামী একটি ফ্লাইট প্রায় আট ঘণ্টা আকাশে থাকার পর কানাডার আকাশসীমায় প্রবেশের অনুমতি না থাকায় আবার দিল্লিতে ফিরে আসে।
ভারতের বেসামরিক বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রক সংস্থার বার্ষিক নিরীক্ষায় গত বছর এয়ার ইন্ডিয়ার ৫১টি নিরাপত্তা ত্রুটি ধরা পড়ে। এর মধ্যে সাতটি ছিল সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ।
অভ্যন্তরীণ সমস্যার পাশাপাশি বৈশ্বিক পরিস্থিতিও এয়ার ইন্ডিয়ার জন্য বড় চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নতুন উড়োজাহাজ সরবরাহে বিলম্ব হওয়ায় বহর আধুনিকায়নের পরিকল্পনা ব্যাহত হয়েছে। একই সঙ্গে দিল্লি-ওয়াশিংটন ও মুম্বাই-সান ফ্রান্সিসকোর মতো গুরুত্বপূর্ণ রুট বন্ধ করতে হয়েছে, যা আয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
ভারতীয় মুদ্রা রুপির মান ডলারের বিপরীতে ১০ শতাংশের বেশি কমে যাওয়াও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ জ্বালানিসহ বিমান সংস্থাগুলোর বড় অংশের খরচ ডলারের সঙ্গে যুক্ত।
বিশ্লেষকদের মতে, টাটা গ্রুপ ও সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সকে এখন আরও বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করতে হতে পারে।
তবে তারা সতর্ক করছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে এয়ার ইন্ডিয়ার আর্থিক অবস্থা আরও খারাপ হতে পারে। উচ্চ জ্বালানি ব্যয়, রুট সংকোচন এবং মুদ্রার অবমূল্যায়নের প্রভাব আগামী মাসগুলোতে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক