সামনে তেলের সর্বোচ্চ চাহিদা, ফুরিয়ে আসছে মজুত
ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জ্বালানি সংকটের প্রাথমিক ধাক্কা সামলে ওঠার পর বৈশ্বিক তেলের বাজারে আপাত শান্ত পরিবেশ বিরাজ করছে। তবে বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এটি আসলে ‘ঝড়ের আগের শান্তাবস্থা’। মূলত চীনের পক্ষ থেকে তেল আমদানি নাটকীয়ভাবে হ্রাস করা এবং যুক্তরাষ্ট্রের রেকর্ড পরিমাণ তেল রপ্তানির ফলেই ইরান যুদ্ধের ধাক্কা এখন পর্যন্ত সামাল দেওয়া সম্ভব হয়েছে। কিন্তু সামনেই তেলের সর্বোচ্চ চাহিদার মৌসুম (পিক সিজন) শুরু হতে যাওয়ায় এই ভঙ্গুর ভারসাম্য বেশি দিন টিকবে না বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন : যুদ্ধের সময় কোথায় আত্মগোপনে ছিলেন নেতানিয়াহু, যা জানা গেল
আরও পড়ুন : ৬০ বছর আগের ‘রহস্য’ আবার আলোচনায়
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলার পর পরই হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয় ইরান। ফলে বিশ্ববাজার থেকে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল গায়েব হয়ে যায়, যা বৈশ্বিক সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। এত বড় ধাক্কার পরও বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড ওয়েলের দাম প্রতি ব্যারেল ১১০ ডলারের কাছাকাছি অবস্থান করছে। যা সংকটের শুরুর দিকের সর্বোচ্চ দামের চেয়ে বেশ কম। এর কারণ, আটলান্টিক অঞ্চলের উৎপাদক দেশগুলো, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র তাদের রপ্তানি ব্যাপক হারে বাড়িয়ে মধ্যপ্রাচ্যের এই ঘাটতি পূরণ করছে। এর পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে আপদকালীন মজুত থেকে রেকর্ড গতিতে তেল উত্তোলন করা হচ্ছে।
চিন ও এশিয়ার কৌশলগত অবস্থান
সংকট মোকাবিলায় বিশ্ববাজারের অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে চীন। বিশ্বের বৃহত্তম এই তেল আমদানিকারক দেশ যুদ্ধের পর থেকে তেল কেনা ব্যাপকভাবে কমিয়ে দিয়েছে। কেপলারের শিপিং ডাটা অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারিতে চীনের সমুদ্রপথে তেল আমদানি যেখানে দৈনিক ১১ দশমিক ৫ মিলিয়ন ব্যারেল ছিল, তা এপ্রিলে কমে ৮ মিলিয়ন ব্যারেলে নেমেছে। চলতি মে মাসে তা আরও কমে ৬ দশমিক ৯ মিলিয়ন ব্যারেলে দাঁড়াতে পারে—যা গত এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। চীনের নিজস্ব প্রায় ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ব্যারেলের বিশাল তেলের মজুত থাকার কারণেই তারা আপাতত আন্তর্জাতিক বাজার থেকে দূরে থাকার এই কৌশল নিতে পেরেছে।
আরও পড়ুন : দীর্ঘদিনের পরিত্যক্ত গাড়ি, অথচ মামলার টোকেন এলো ‘হাই স্পিডে’ চালানোর
আরও পড়ুন : নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও রুবিও কীভাবে চীনে আছেন
অন্যদিকে, চীন ছাড়া এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলোতে এপ্রিলেই তেল আমদানি প্রায় ২৭ শতাংশ বেড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের ওপর ৬০ শতাংশ নির্ভরশীল এশীয় শোধনাগারগুলো এখন বিকল্প হিসেবে দূরবর্তী যুক্তরাষ্ট্র ও লাতিন আমেরিকা থেকে তেল আমদানি করছে। এর ফলে এপ্রিলে মার্কিন সমুদ্রপথের তেল রপ্তানি রেকর্ড ৮ দশমিক ৫৫ মিলিয়ন ব্যারেলে পৌঁছায়। মে মাসে রপ্তানি ১০ মিলিয়ন ব্যারেল ছাড়িয়ে যাওয়ার পথে রয়েছে, যা বিশ্বমঞ্চে বৃহত্তম তেল ও গ্যাস উৎপাদক হিসেবে আমেরিকার অবস্থানকে আরও পোক্ত করল।
রয়টার্সের কলামিস্ট রন বুসো তার এক বিশ্লেষণে সতর্ক করেছেন, বর্তমানের এই স্থিতিশীলতাকে স্থায়ী ভাবলে ভুল হবে। ইতোমধ্যে ১২তম সপ্তাহে ধরে বন্ধ রয়েছে হরমুজ প্রণালি। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) তথ্যমতে, যুদ্ধের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ট্যাংকার ও অন্যান্য উৎসসহ বিশ্বের মোট তেলের মজুত প্রায় ২৪৬ মিলিয়ন ব্যারেল হ্রাস পেয়েছে, যা দৈনিক ৪ মিলিয়ন ব্যারেল ফুরিয়ে যাওয়ার সমান।
সামনে উত্তর গোলার্ধের দেশগুলোতে গ্রীষ্মকাল শুরু হতে যাচ্ছে, যে সময়টিতে সাধারণত বিশ্বজুড়ে জ্বালানির চাহিদা চূড়ায় পৌঁছায়। এই উচ্চ চাহিদার মুখে শোধনাগারগুলো যখন নতুন করে তেল মজুতের প্রতিযোগিতা শুরু করবে, তখন এই সংকটের আসল রূপ প্রকাশ পাবে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গ্রীষ্মকালীন অভ্যন্তরীণ চাহিদা বৃদ্ধি পেলে দেশটির নিজেদের বাজারেও জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী হতে পারে, যা ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য রাজনৈতিক চাপ তৈরি করবে। বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি যত বেশি দিন বন্ধ থাকবে, বিশ্ব অর্থনীতিতে এই যুদ্ধের ক্ষত তত বেশি দৃশ্যমান এবং যন্ত্রণাদায়ক হয়ে উঠবে। সূত্র : রয়টার্স

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক