বিনামূল্যে ভালো খাবার খেতেই ডেটিংয়ে যান ৪০ শতাংশ মার্কিনি!
আপনি কি কোনো রেস্তোরাঁয় ডেটে বসেছেন? আপনার ঠিক সামনের টেবিলে বসা সঙ্গীটি কিন্তু আপনার প্রেমে মজে নয়, বরং স্রেফ নিখরচায় ভালো একবেলা খাবার খেতেই আপনার সঙ্গে ডেটে আসতে পারেন! সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের এক সমীক্ষায় উঠে এসেছে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য। বর্তমানের এই ‘খাবারের জন্য ডেটিং’ ট্রেন্ডটিকে অনেকে এক ধরনের ‘লাইফ হ্যাক’ হিসেবেও বিবেচনা করছেন। খবর ফক্স নিউজ।
যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়াভিত্তিক ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস কোম্পানি ‘জেজি ওয়েন্টওয়ার্থ’ সম্প্রতি আধুনিক রোমান্সের খরচের ওপর ভিত্তি করে ‘লাভ অন এ বাজেট : আর আমেরিকানস টু ব্রোক টু ডেট?’ শীর্ষক একটি জরিপ পরিচালনা করে। এক হাজার ৫৩৮ জন মার্কিন প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের ওপর চালানো এই জরিপে দেখা গেছে, ৩৯ দশমিক ৯ শতাংশ (প্রায় ৪০%) উত্তরদাতাই স্বীকার করেছেন যে তারা কেবল বিনামূল্যে খাবার পেতেই অন্তত একবার হলেও কারো সঙ্গে ডেটে গেছেন।
জরিপে আরও বলা হয়, ২৭ দশমিক পাঁচ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন তারা বিনামূল্যে খাবারের জন্য কখনো ডেটে যাননি, তবে এমনটা করার কথা একাধিকবার ভেবেছেন বা বিবেচনা করেছেন। অন্যদিকে, বাকি ৩২ দশমিক ছয় শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন তারা কখনোই এমনটা করার কথা ভাবেননি।
আকাঙ্ক্ষা বাড়ছে ব্যয়ের, বাড়ছে ‘মেনু প্রাইস ফ্যাটিগ’
মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’-এর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে ২০ থেকে ৩০ বছর বয়সীরাই মূলত এই ঐতিহ্যবাহী ডিনার ডেটের সংস্কৃতিকে আবার ফিরিয়ে আনছেন। তবে দেশজুড়ে ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির কারণে রেস্তোরাঁর খাবারের দাম বাড়ছে, যা মার্কিন নাগরিকদের মাঝে ‘মেনু প্রাইস ফ্যাটিগ’ বা মেনুর দাম নিয়ে এক ধরনের ক্লান্তি তৈরি করেছে।
গবেষকদের প্রধান আবিষ্কারগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো, একজন গড় আমেরিকানকে প্রথম ডেটের পেছনে গড়ে প্রায় ৯৩ ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১১ হাজার টাকা) খরচ করতে হয়। এ কারণে ৬০ দশমিক এক শতাংশ আধুনিক ডেটার মনে করেন যে, অতীতের তুলনায় বর্তমানে ডেটিংয়ের ক্ষেত্রে খরচের প্রত্যাশা ও চাপ অনেক বেশি।
অর্থনৈতিক সংকটে থমকে যাচ্ছে প্রেম
টাকা-পয়সার দুশ্চিন্তা যদি আপনার প্রেমের জীবনে প্রভাব ফেলে থাকে, তবে বুঝে নেবেন এই তালিকায় আপনি একাকী নন। জরিপ অনুযায়ী, ২৯ দশমিক পাঁচ শতাংশ (প্রায় প্রতি ১০ জনে ৩ জন) মানুষ টাকার অভাবে বা বাজেট না থাকায় ডেটের আমন্ত্রণ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। অন্যদিকে, ৮৫ দশমিক সাত শতাংশ মানুষ প্রথম ডেটের পর দ্বিতীয়বার ডেটে যেতে রাজি হননি, কারণ তারা মনে করেছেন যে অপর মানুষটির সঙ্গে তাদের আর্থিক অবস্থার বা বাজেটের কোনো সামঞ্জস্য নেই।
লুকানো এজেন্ডা ও সততার সংকট
টেক্সাসভিত্তিক ব্যক্তিগত ও পেশাদার উন্নয়নবিষয়ক বিশেষজ্ঞ জ্যান গস ফক্স নিউজ ডিজিটালকে বলেন, ‘ফ্রি খাবারের জন্য ডেটিংয়ে যাওয়ার এই প্রবণতা আসলে মানুষের আচরণের একটি বড় পরিবর্তনের প্রতিফলন। ডেটিং, বিজনেস মিটিং বা বন্ধুত্ব—যেকোনো সম্পর্কই গড়ে ওঠে বিশ্বাসের ওপর। তাই আমরা যখন কোনো গোপন এজেন্ডা বা স্বার্থ নিয়ে সেখানে হাজির হই, তখন সম্পর্ক শুরুর আগেই তার ভিত্তিটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যায়।’
জ্যান গস আরও বলেন, আমরা এমন এক সংস্কৃতিতে বাস করছি যা অনেক সময় ‘বিনা পরিশ্রমে কিছু পাওয়া’ বা ‘ফ্রি কিছু পাওয়াকে’ উদযাপন করি। আর সে কারণেই ডেটের নামে ফ্রি খাবার খাওয়াকে অনেকে ‘লাইফ হ্যাক’ ভাবছেন। এর পেছনে অবশ্যই একটি অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট রয়েছে, কারণ সময়টা অনেকের জন্যই কঠিন এবং মূল্যস্ফীতি অত্যন্ত বাস্তব। মানুষ টিকে থাকার জন্য সংগ্রাম করছে। তবে আর্থিক অনটন কখনোই আমাদের সততা বা নৈতিকতার সঙ্গে আপস করার অধিকার দেয় না।
ডেটিং শিষ্টাচার ও জ্যান গসের পরামর্শ
প্রচলিত শিষ্টাচার বা প্রোটোকল অনুযায়ী, যিনি ডেটের আমন্ত্রণ জানাবেন, বিল পরিশোধের দায়িত্ব মূলত তারই। জ্যান গস বলেন, যদি কেউ আপনাকে ডিনারে যাওয়ার প্রস্তাব দেয়, তবে ধরে নেওয়া হয় যে তিনিই বিল মেটাবেন। তবে যেকোনো ধরনের ভুল বোঝাবুঝি বা প্রতারিত হওয়া এড়াতে শুরুতেই বিষয়টি পরিষ্কার করে নেওয়া এবং খরচের প্রত্যাশা কেমন তা সরাসরি সঙ্গী বা খাবার সঙ্গীকে জিজ্ঞাসা করা পুরোপুরি গ্রহণযোগ্য।
নিজের খাবারের টাকা নিজে দেওয়ার সামর্থ্য বা বাজেট না থাকলে সঙ্গীকে সরাসরি বলা উচিত—এই সপ্তাহে এটি আমার বাজেটের মধ্যে নেই। জ্যান গসের মতে অন্য একটি নিয়ম হলো—বাইরে খেতে গেলে সবসময় নিজের বিল নিজে দেওয়ার মতো টাকা পকেটে রাখা উচিত। অপর পক্ষই পুরো বিল মেটাবে—এমনটা আগে থেকে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। তিনি বলেন, বাইরে গেলে নিজের খাবারের দায়িত্ব নেওয়ার মতো সামর্থ্য আমার সবসময় থাকে। নিজের খাবারের বিল নিজে দেওয়াটা একটি ভদ্রতা, বিশেষ করে প্রথম ডেটে যখন আপনি জানেন না যে সম্পর্কটি কোন দিকে মোড় নেবে। তাই প্রথমত, অর্ডার করার সময় সতর্ক হোন। দ্বিতীয়ত, বিল আসার পর বিনয়ের সাথে বলুন—আমি তোমার সাথে এই বিলটি শেয়ার বা স্প্লিট (আধাআধি) করতে পারলে খুশি হব।'
জ্যান গস মনে করেন, শুরু থেকেই প্রত্যাশা সুনির্দিষ্ট করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি নিজে যখন বন্ধুদের কোনো গ্রুপকে বাইরে আমন্ত্রণ জানান, তখন আগেই সবাইকে জানিয়ে দেন যে প্রত্যেকে যার যার খরচ নিজে বহন করবেন।
সবশেষে জ্যান গস বলেন, ডেটে গিয়ে ভালো আচরণ করুন, সৎ থাকুন এবং টেবিলের ওপাশে বসা মানুষটিকে সম্মান জানান। আর তা না পারলে বাড়িতেই থাকুন। এই পুরো বিষয়ের মূল সমস্যাটি কে বিল দিচ্ছে তা নিয়ে নয়; মূল বিষয়টি হলো আমরা অপর পাশের মানুষটিকে একজন মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন করছি নাকি স্রেফ একটা সুযোগ বা ‘ফ্রি খাবারের মাধ্যম’ হিসেবে ব্যবহার করছি।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক