১৪ বছর বয়সী কিশোরীর নৃশংস হত্যাকাণ্ডে উত্তাল আর্জেন্টিনা
ঠিক এগারো বছর আগের কথা। ২০১৫ সালের মে মাসে আর্জেন্টিনার চিয়ারা পায়েজ নামের এক ১৪ বছরের অন্তঃসত্ত্বা কিশোরীকে তার ১৬ বছর বয়সী প্রেমিক অত্যন্ত নৃশংসভাবে হত্যা করে। সেই লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ড আর্জেন্টিনায় এক অভূতপূর্ব গণবিক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল, যা পরবর্তীতে ‘নি উনা মেনোস’ অর্থাৎ ‘একটি নারীও কম নয়’ স্লোগান নিয়ে পুরো ল্যাটিন আমেরিকায় নারী অধিকার ও সুরক্ষার এক ঐতিহাসিক গণআন্দোলনে রূপ নেয়। বিশ্বজুড়ে যা পরিচিতি পায় ‘ফেমিসাইড’ বা লিঙ্গভিত্তিক নারীহত্যা হিসেবে।
১১ বছর পর সেই একই ইতিহাসের নারকীয় পুনরাবৃত্তি ঘটল আর্জেন্টিনায়। এবার দেশটির কর্ডোবা শহরে অগাস্টিনা ভেগা নামের আরেক ১৪ বছরের কিশোরীকে পৈশাচিক কায়দায় হত্যার ঘটনায় পুরো দেশজুড়ে আবারও তীব্র ক্ষোভ ও গণবিক্ষোভের দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে।
তদন্ত ও প্রাথমিক ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২৩ মে রাতে অগাস্টিনা তার মায়ের জন্য একটি উপহার আনতে তাদের এক পারিবারিক বন্ধুর বাড়িতে গিয়েছিল। সেখানে তাকে লম্পট উগ্রবাদী ক্লডিও ব্যারেলিয়ার (৩৩) যৌন নিপীড়ন করার পর শ্বাসরোধে হত্যা করে। পরে একটি রান্নাঘরের ছুরি দিয়ে তার মরদেহ টুকরো টুকরো করে। নিখোঁজ হওয়ার এক সপ্তাহ পর গত শনিবার একটি ড্রেনে অগাস্টিনার দেহাংশ উদ্ধার করা হয়। খবর এপির।
এই খবর ছড়িয়ে পড়ার পরপরই দেশটির রাজধানী বুয়েনস আইরেসসহ বিভিন্ন শহরে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন। বার্ষিক ‘নি উনা মেনোস’ আন্দোলনের সমাবেশে এবার অগাস্টিনার হত্যাকাণ্ডের বিচার এবং উগ্র ডানপন্থি প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেইয়ের নারীবিদ্বেষী নীতির বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়।
অগাস্টিনার পরিবারের আইনজীবী গুস্তাভো ভাকা জানিয়েছেন, অগাস্টিনা নিখোঁজ হওয়ার পরদিনই পুলিশকে জানানো হলেও নিখোঁজ সংক্রান্ত চাইল্ড অ্যালার্ট জারি করতে পুলিশ প্রায় ৮০ ঘণ্টারও বেশি সময় ক্ষেপণ করে। ঘটনার পরদিনই একজন ট্যাক্সি চালক পুলিশকে জানিয়েছিলেন, তিনি অগাস্টিনাকে ব্যারেলিয়ারের বাড়িতে নামিয়ে দিয়েছিলেন, যা সিসিটিভি ফুটেজেও দেখা গেছে। কিন্তু স্থানীয় পুলিশের পুরো মনোযোগ তখন শহরের একটি বড় ফুটবল ম্যাচের দিকে। তারা খেলা দেখতে আসা দর্শক নিয়ন্ত্রণে ব্যস্ত থাকায় অগাস্টিনার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়নি। ৩ দিন পর পুলিশ ব্যারেলিয়ারের বাড়িতে অভিযান চালায়।
তদন্তে জানা গেছে, মূল অভিযুক্ত ব্যারেলিয়ার ইতোপূর্বেও এক তরুণীকে অপহরণের দায়ে গ্রেপ্তার হয়েছিল। কিন্তু মাত্র ২০ দিন পর ৩ হাজার ৫০০ ডলার দিয়ে জামিনে মুক্তি পেয়ে যায়। পুলিশের এই গড়িমসি ও গাফিলতির বিরুদ্ধে মানুষ রাস্তায় টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করলেও স্থানীয় প্রধান প্রসিকিউটর রাউল গার্জন সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, কর্তৃপক্ষ এই বিষয়ে কোনো আত্মসমালোচনা করছে না।
এমনকি দেশটির নিরাপত্তা মন্ত্রী আলেজান্দ্রা মন্তেওলিভা এই ঘটনাকে ‘ফেমিসাইড’ বা লিঙ্গভিত্তিক নারীহত্যা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন, যা নিয়ে ক্ষোভ আরও বেড়েছে। উল্লেখ্য, আর্জেন্টিনায় সাধারণ হত্যাকাণ্ডের চেয়ে ফেমিসাইডের শাস্তি অনেক বেশি। এর একমাত্র সাজা বাধ্যতামূলক যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।
বিক্ষোভকারীদের মূল ক্ষোভ এখন আর্জেন্টিনার বর্তমান উগ্র ডানপন্থী ও লিবার্টেরিয়ান প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেইয়ের বিরুদ্ধে, যিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কট্টর মিত্র হিসেবে পরিচিত। মিলেই নারী আন্দোলনকে ‘হাস্যকর ও প্রাকৃতিক নিয়ম-বহির্ভূত লড়াই’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি দেশের দণ্ডবিধি থেকে ‘ফেমিসাইড’ বা নারীহত্যার সুনির্দিষ্ট ধারাটি পুরোপুরি বাদ দেওয়ারও প্রস্তাব করেছেন।
সাশ্রয়ী নীতি ও তথাকথিত ‘সংস্কৃতি যুদ্ধ’-এর নামে প্রেসিডেন্ট মিলেই গত আড়াই বছরে আর্জেন্টিনার নারী বিষয়ক মন্ত্রণালয় বিলুপ্ত করেছেন, বৈষম্য বিরোধী ইনস্টিটিউট বন্ধ করে দিয়েছেন ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার শিকার নারীদের সহায়তার জন্য বরাদ্দ সব সরকারি তহবিল ও পুনর্বাসন প্রোগ্রাম বন্ধ করে দিয়েছেন। নারীদের জরুরি সহায়তার ২৪ ঘণ্টার হটলাইন বাজেটের দুই-তৃতীয়াংশ এবং অর্ধেক কর্মী ছাঁটাই করা হয়েছে। এছাড়া পারিবারিক ও যৌন সহিংসতার শিকার নারীদের বিনামূল্যে আইনি সহায়তা দেওয়ার সরকারি উইংটিও পুরোপুরি ভেঙে দেওয়া হয়েছে।
হিউম্যান রাইটস গ্রুপ ‘সেন্টার ফর লিগ্যাল অ্যান্ড সোশ্যাল স্টাডিজের’ আইনজীবীরা জানিয়েছেন, চলতি বছরে এখন পর্যন্ত সরকারিভাবে ৬৩টি ফেমিসাইড নথিভুক্ত হলেও প্রকৃতপক্ষে এই সংখ্যা ১০০ পার হয়ে গেছে, যা সরকার আড়াল করার চেষ্টা করছে। সরকারি পরিসংখ্যানে নারীহত্যা ১২ শতাংশ কমেছে বলে দাবি করা হলেও অধিকারকর্মীদের মতে, এটি অপরাধ কমার লক্ষণ নয়, বরং সরকার অপরাধগুলোকে সঠিকভাবে ‘ফেমিসাইড’ হিসেবে নথিভুক্ত না করার কারণে এমনটা দেখাচ্ছে।
স্থানীয় সময় বুধবার (৪ মে) বুয়েনস আইরেসের প্লাজা কংগ্রেসের সামনে আয়োজিত বিশাল সমাবেশে যোগ দিয়েছিলেন ৪১ বছর বয়সী লরা লিনাজা। দীর্ঘ এক দশক পর তিনি কোনো বিক্ষোভ কর্মসূচিতে এলেন, তাও আবার তার ১৭ বছর বয়সী মেয়ে মিলেনাকে সঙ্গে নিয়ে। মিলেনা তার মায়ের হাত শক্ত করে ধরে বলে, ‘আমি লড়াই করছি আমার নিজের জন্য, আমার ১১ বছর বয়সী ছোট বোনের জন্য ও আমার চেনা সব নারীর নিরাপত্তার জন্য।’
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল আর্জেন্টিনার পরিচালক লুসিলা গালকিন বলেন, যে মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিতের বিষয়গুলো আমরা বহু বছর আগেই অর্জন করেছিলাম বলে ভেবেছিলাম, এই সরকারের আমলে সেই অধিকারগুলো রক্ষার জন্য আমাদের আজ আবারও গোড়া থেকে লড়াই করতে হচ্ছে।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক