যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি চুক্তি, তবুও অনিশ্চয়তায় ইরানিরা
প্রায় চার মাসের সংঘাতের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যুদ্ধবিরতি ও সমঝোতা চুক্তিতে পৌঁছানোর ঘোষণা দিলেও ইরানের সাধারণ মানুষের মধ্যে এখনও স্বস্তি বা আস্থার পরিবেশ তৈরি হয়নি। অনেকেই মনে করছেন, দীর্ঘমেয়াদে এই চুক্তি টিকে থাকবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট অনিশ্চয়তা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরের মাধ্যমে সংঘাতের অবসান ঘটানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগামী শুক্রবার (১৯ জুন) আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তিটি স্বাক্ষর হওয়ার কথা রয়েছে। খবর আল জাজিরার।
চুক্তির আওতায় হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করা হবে, যা যুদ্ধ শুরুর পর থেকে কার্যত ইরানের নিয়ন্ত্রণে ছিল। একই সঙ্গে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ তুলে নেওয়ার কথাও রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এতে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরতে পারে।
তবে এখনও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অমীমাংসিত রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ, যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নিষেধাজ্ঞা এবং বিদেশে আটকে থাকা ইরানের বিপুল পরিমাণ সম্পদ। এসব বিষয় পরবর্তী আলোচনার জন্য রেখে দেওয়া হয়েছে।
তেহরানের এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী পারিসা বলেন, এই চুক্তি সাধারণ মানুষের জীবনে খুব বেশি পরিবর্তন আনবে বলে আমি মনে করি না। হয়তো কিছুদিন কাজ করবে, কিন্তু উভয় পক্ষই নিজেদের স্বার্থে এটি ভঙ্গ করতে পারে।
রাজধানীর আরেক বাসিন্দা মেহদি বলেন, আমি আশাবাদী নই। এখনও অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অমীমাংসিত রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র ইরানের দাবিগুলো সহজে মেনে নেবে বলে মনে হয় না।
ইরানের অনেক নাগরিক মনে করেন, দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকট কাটাতে হলে যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘের কঠোর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে। পাশাপাশি বিদেশে জব্দ হয়ে থাকা ইরানি সম্পদ মুক্ত করা এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজ থেকে ফি আদায়ের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
চুক্তি ঘোষণার পরও ইরানের অভ্যন্তরে মতবিরোধ স্পষ্ট। দেশটির কট্টরপন্থীরা মনে করেন, সরকার আলোচনায় অতিরিক্ত ছাড় দিয়েছে। তারা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি অবিশ্বাস বজায় রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
সোমবার (১৫ জুন) তেহরানের ভ্যালিয়াসর স্কয়ারে নিহত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির একটি বিশাল প্রতিকৃতি উন্মোচন করা হয়। তিনি জীবদ্দশায় বারবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি অবিশ্বাসের কথা বলেছিলেন।
অনেক সরকারপন্থী সমর্থকও মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র ভবিষ্যতে আবারও চুক্তি লঙ্ঘন করতে পারে। তাদের মতে, ইরানের উচিত হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণসহ যুদ্ধের সময় অর্জিত কৌশলগত সুবিধাগুলো ধরে রাখা।
তবে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও অর্থনৈতিক বাজারে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনায় ইরানের মুদ্রার মান কিছুটা শক্তিশালী হয়েছে। এক মার্কিন ডলারের বিপরীতে রিয়ালের বিনিময় হার উন্নত হয়েছে।
এছাড়া স্বর্ণমুদ্রার দাম কমেছে এবং তেহরান স্টক এক্সচেঞ্জের সূচক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, বন্দর অবরোধ প্রত্যাহার, সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞা শিথিলকরণ এবং বিদেশে জব্দ সম্পদ মুক্ত হলে ইরানের অর্থনীতি নতুন গতি পেতে পারে।
তবে এসব সম্ভাবনা বাস্তবে কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে ভবিষ্যৎ আলোচনা ও উভয় পক্ষের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ওপর।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক