ইরান যুদ্ধ থেকে লাভের হিসাব করছে চীন, বাড়ছে কূটনৈতিক প্রভাব
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরু করার পর চীনের নেতারা আশঙ্কা করেছিলেন, তেহরানের সরকারও ভেনেজুয়েলার মতো পতনের মুখে পড়তে পারে। তবে প্রায় চার মাস পর পরিস্থিতি বদলে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে অন্তর্বর্তী চুক্তি হয়েছে, তেহরানের সরকার টিকে আছে এবং এই যুদ্ধকে অনেকেই যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতার প্রমাণ হিসেবে দেখছেন।
একই সময়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চীনের কূটনৈতিক প্রভাব বেড়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। বেইজিং নিজেকে শান্তির পক্ষে অবস্থানকারী শক্তি হিসেবে তুলে ধরেছে এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতাদের আতিথ্য দিয়েছে। এমনকি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ইরান যুদ্ধের সময় চীনের ভূমিকার প্রশংসা করেছেন। খবর সিএনএনের।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে বেইজিং সক্রিয় ভূমিকা রাখতে প্রস্তুত। যদিও চীন সরাসরি কোনো মধ্যস্থতার কথা স্বীকার করেনি, তবে তারা যুদ্ধ বন্ধে নিজেদের নিরলস প্রচেষ্টার কথা উল্লেখ করেছে।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এপ্রিল মাসে চার দফা শান্তি প্রস্তাব উত্থাপন করেন। যুদ্ধ চলাকালে চীন একদিকে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার নিন্দা জানায় এবং মার্কিন নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ইরানি তেল কেনা অব্যাহত রাখে, অন্যদিকে উভয় পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগও বজায় রাখে।
যুদ্ধ চলাকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এবং পাকিস্তানের নেতাসহ একাধিক দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব বেইজিং সফর করেন। এতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চীনের কূটনৈতিক অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়েছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিশ্লেষণে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে এই সংকট যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নতুন কোনো ‘সুয়েজ মুহূর্ত’ কিনা। ১৯৫০-এর দশকের সুয়েজ সংকট যেমন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পতনের সূচক ছিল, তেমনি ইরান যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক আধিপত্যেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে মত দিয়েছেন চীনা বিশ্লেষকরা।
তাদের মতে, এই যুদ্ধ দেখিয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি আগের মতো অপ্রতিদ্বন্দ্বী নয় এবং পশ্চিমা জোটেও বিভক্তির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। একই সঙ্গে চীনের জ্বালানি মজুত, সবুজ প্রযুক্তি এবং বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহার দেশটিকে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বাড়তি সুবিধা দিয়েছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমে গেলেও তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে চীনের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার নিশ্চয়তা নয়। চীন দীর্ঘদিন ধরে বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছে এবং নিজেদের যুক্তরাষ্ট্রের মতো একক পরাশক্তি হিসেবে দেখতে চায় না।
বেইজিংভিত্তিক সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক সান চেংহাও বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র এখনও সবচেয়ে শক্তিশালী বহিরাগত শক্তি। তবে সেই প্রভাব ধরে রাখতে এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক মূল্য দিতে হচ্ছে।
তার মতে, সার্বভৌমত্ব, অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা এবং রাজনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দেওয়ার কারণে চীনের দৃষ্টিভঙ্গি অনেক দেশের কাছে আরও গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠতে পারে। তবে প্রকৃত বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনের জন্য শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করলেই হবে না, বরং শান্তি প্রতিষ্ঠা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে কার্যকর সমাধানও দিতে হবে।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক