ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্পে নিহত বেড়ে দেড় হাজারের কাছাকাছি
ভয়াবহ ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত ভেনেজুয়েলায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে প্রায় ১ হাজার ৫০০ জনে পৌঁছেছে। আহত হয়েছেন ৩ হাজার ১৫০ জন। এছাড়া বাস্তুচ্যুত হয়েছেন ১২ হাজার ৭২১ জন। দেশটির সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত উপকূলীয় রাজ্য লা গুয়াইরা এবং রাজধানী কারাকাসে ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপে এখনও জীবিতদের খুঁজে বের করতে দিনরাত কাজ করছেন দেশি-বিদেশি উদ্ধারকর্মীরা।
স্থানীয় সময় বুধবার (২৪ জুন) আঘাত হানা ৭ দশমিক ২ এবং ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর থেকে এখন পর্যন্ত শত শত আফটারশক অনুভূত হয়েছে। এতে উদ্ধার অভিযান আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। ভূমিকম্পের পরপরই বহু ভবন ধসে পড়ে এবং হাজার হাজার মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েন। খবর রয়টার্সের।
ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ স্থানীয় সময় রোববার (২৮ জুন) বলেন, উদ্ধার অভিযান এখনও অব্যাহত রয়েছে এবং ধ্বংসস্তূপ থেকে জীবিত মানুষ উদ্ধারের ঘটনা ঘটছে। তাই অনুসন্ধান কার্যক্রম বন্ধ করা হচ্ছে না।
রদ্রিগেজ আরও বলেন, আজও আমরা জীবিত মানুষ উদ্ধার করেছি। যতক্ষণ পর্যন্ত বেঁচে থাকার সম্ভাবনা থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত উদ্ধার অভিযান চলবে। আমরা কখনও আশা ছাড়ছি না।
ডেলসি রদ্রিগেজ জানান, ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলো বসবাসের উপযোগী কি না, তা যাচাই করতে একটি বিশেষ প্রেসিডেন্সিয়াল কমিশন গঠন করা হয়েছে। এছাড়া স্কুল-কলেজ আরও এক সপ্তাহ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত লা গুয়াইরা রাজ্যে বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রায় ৭৫ শতাংশ ইতোমধ্যে পুনরুদ্ধার করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির প্রেসিডেন্ট হোর্হে রদ্রিগেজ জানান, রোববার আরও ২০ জনের মরদেহ উদ্ধার হওয়ায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১ হাজার ৪৫০ জনে পৌঁছেছে। আহতের সংখ্যা ৩ হাজার ১৫০ এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা ১২ হাজার ৭২১।
হোর্হে রদ্রিগেজ বলেন, এখন পর্যন্ত ৭৭৪টি ভবন সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের সংখ্যা আরও অনেক বেশি।
হোর্হে বলেন, এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় চলছে। যত বেশি সম্ভব মানুষকে জীবিত উদ্ধার করতে হবে এবং যাদের ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়েছে বা সেখানে ফেরা সম্ভব নয়, তাদের জন্য অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি করতে হবে।
সরকারি হিসাবে নিখোঁজের সংখ্যা কয়েকশ হলেও বিরোধী পক্ষের সমর্থিত একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্মে প্রায় ৫০ হাজার মানুষকে এখনও নিখোঁজ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। আগের দিন এ সংখ্যা ছিল প্রায় ৫৫ হাজার।
এতে ধারণা করা হচ্ছে, অনেক মানুষ এখনও ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকতে পারেন অথবা তাদের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
ভূমিকম্পের পর প্রথম কয়েকদিন স্থানীয় বাসিন্দা ও স্বেচ্ছাসেবকেরাই হাতে থাকা সামান্য যন্ত্রপাতি দিয়ে উদ্ধারকাজ চালান। পরে যুক্তরাষ্ট্র, সুইজারল্যান্ড, মেক্সিকো, কলম্বিয়া, কাতারসহ বিভিন্ন দেশ থেকে ২ হাজার ৬০০-এর বেশি বিশেষায়িত উদ্ধারকর্মী ভেনেজুয়ায় পৌঁছান।
সুইস উদ্ধারকারী দলের প্রধান সেবাস্টিয়ান ইউগস্টার বলেন, ভূমিকম্পের পর প্রথম ৭২ ঘণ্টা জীবিত মানুষ উদ্ধারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। এরপর জীবিত পাওয়ার সম্ভাবনা দ্রুত কমে যায়।
ইউগস্টার জানান, তাদের অনুসন্ধানী কুকুর ধ্বংসস্তূপের নিচে একাধিক জীবিত মানুষের অবস্থান শনাক্ত করলেও অনেককে সময়মতো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
উদ্ধার অভিযানে কয়েকটি অলৌকিক ঘটনা ঘটেছে। যুক্তরাষ্ট্রের উদ্ধারকারী দল ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে একটি শিশুকে জীবিত উদ্ধার করেছে। এ ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর।
এছাড়া কলম্বিয়ার উদ্ধারকারী দল ধ্বংসস্তূপের প্রায় ৩ মিটার নিচে আটকে থাকা ১১ বছর বয়সী মোইসেস নামে এক শিশুকে জীবিত উদ্ধার করেছে। তার একটি হাত ভেঙে গেছে। তবে এই দুর্ঘটনায় তার মা ও বোন নিহত হয়েছেন।
মেক্সিকোর উদ্ধারকারী দলও কারাবালেদা শহরের একটি ধসে পড়া ভবন থেকে আরও এক ১১ বছর বয়সী শিশুকে জীবিত উদ্ধার করেছে।
ভূমিকম্পের পর আন্তর্জাতিক সহায়তা অব্যাহত রয়েছে। পোপ লিও ভেনেজুয়াবাসীর প্রতি সংহতি প্রকাশ করে নিহতদের জন্য প্রার্থনা করেছেন এবং উদ্ধারকর্মীদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন।
মার্কিন প্রশাসন জানিয়েছে, আগে ঘোষিত ১৫ কোটি ডলারের সহায়তার পাশাপাশি আরও কয়েকশ মিলিয়ন ডলারের নতুন সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণা করা হবে।
এদিকে ব্যাপক বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে রোববার ভেনেজুয়েলার বৃহত্তম আমুয়াই তেল শোধনাগারের কার্যক্রমও বন্ধ হয়ে গেছে। এতে দেশটির জ্বালানি সরবরাহ এবং অর্থনীতিতে নতুন করে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক