জাতিসংঘ সদর দপ্তরের সামনে গায়ে আগুন লাগিয়ে এক ব্যক্তির আত্মাহুতি
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরের সামনে তিব্বতের পতাকা হাতে এক ব্যক্তি নিজের শরীরে আগুন ধরিয়ে আত্মাহুতি দিয়েছেন। স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) সন্ধ্যার এই ঘটনায় গুরুতর দগ্ধ অবস্থায় ওই ব্যক্তিকে হাসপাতালে নিলে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মার্কিন মাটিতে কোনো তিব্বতি অধিকার কর্মীর এভাবে আত্মাহুতির ঘটনা অত্যন্ত বিরল বলে উল্লেখ করেছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো। খবর সিএনএনের।
নিউইয়র্ক সিটি পুলিশ ডিপার্টমেন্টের একজন মুখপাত্র জানান, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে একটি ৯১১ জরুরি কল পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। সেখানে তারা আনুমানিক ৫২ বছর বয়সী এক ব্যক্তিকে পুরো শরীরে মারাত্মক দগ্ধ অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠায়। পরবর্তীতে কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ঘটনার তদন্ত চলমান থাকায় পুলিশ এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে নিহতের পরিচয় প্রকাশ করেনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে লাইভ করা একটি ভিডিওতে দেখা যায়, ওই ব্যক্তি ফার্স্ট অ্যাভিনিউতে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের ঠিক বিপরীতে তিব্বতের পতাকা হাতে এসে দাঁড়ান। মুহূর্তের মধ্যে তার শরীরে আগুন দাউদাউ করে জ্বলে ওঠে। রাস্তায় গাড়ি চলাচলের মাঝেই তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। পরে দুইজন ব্যক্তি অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র দিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করেন।
একই ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে প্রায় একই সময়ে পোস্ট করা অন্য একটি ভিডিওতে ওই ব্যক্তিকে তিব্বতবাসীর উদ্দেশে তিব্বতের ‘স্বাধীনতার’ জন্য একতাবদ্ধ হয়ে কাজ করার এবং নিজেদের ঐতিহ্য ও পরিচয় ‘কখনও ভুলে না যাওয়ার’ আহ্বান জানাতে শোনা যায়। ভিডিওতে তিনি চীনের কমিউনিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বেইজিং এমন সব নীতিমালা তৈরি করছে যার মূল উদ্দেশ্যই হলো তিব্বতিদের নিজস্ব পরিচয়, সংস্কৃতি ও ভাষাকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়া।
নির্বাসিত তিব্বতি সরকারের তথ্যমতে, তিব্বতের ওপর চীনের শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে গত কয়েক দশকে বহু তিব্বতি আত্মাহুতির পথ বেছে নিয়েছেন। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এই ধরনের প্রতিবাদের ঘটনা নজিরবিহীন। এই ঘটনার পর বৃহস্পতিবার রাতে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের সামনে বিপুল সংখ্যক তিব্বতি সমর্থক ও আন্দোলনকারী জড়ো হয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। তিব্বতি লেখক ও অধিকার কর্মী জাময়াং নরবু নিহতের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, ওই ব্যক্তি ১৯৮০-এর দশকে তিব্বত থেকে নির্বাসিত হয়ে নিউইয়র্কে আসেন। তিনি একজন স্বাধীনতাকামী কর্মী ও তিব্বতি কমিউনিটির নেতা ছিলেন। নিউইয়র্কে ট্যাক্সি ক্যাব চালাতেন।
উল্লেখ্য, ১৯৫১ সাল থেকে তিব্বত শাসন করছে চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টি। তিব্বতিরা দীর্ঘদিন ধরে তাদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার ওপর বেইজিংয়ের কঠোর বিধিনিষেধের প্রতিবাদ জানিয়ে আসছে। তিব্বতিদের এই ক্ষোভ আরও উস্কে দিয়েছে গত ১ জুলাই থেকে চীনে কার্যকর হওয়া একটি নতুন ‘জাতিগত ঐক্য আইন’। এই বিতর্কিত আইনের মাধ্যমে সংখ্যালঘু অঞ্চলে স্কুল ও সরকারি প্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলকভাবে চীনা ভাষার ব্যবহার সম্প্রসারণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। তিব্বতি অধিকার কর্মীরা আশঙ্কা করছেন, এই কঠোর আইনের ফলে চীনের সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীগুলোর নিজস্ব সংস্কৃতি ও ভাষার অস্তিত্ব পুরোপুরি বিলীন হয়ে যাবে।
জাতিসংঘের একজন মুখপাত্র বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে (এপি) জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবারের এই ঘটনাটি যখন ঘটে তখন জাতিসংঘের নির্ধারিত সব বৈঠক শেষ হয়ে গিয়েছিল। ফলে জাতিসংঘের দাপ্তরিক কার্যকলাপে এর কোনো প্রভাব পড়েনি।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক