মাশহাদে প্রতিশোধের ডাক, আলী খামেনির দাফন অনুষ্ঠানে জনতার ঢল
তীব্র গরম উপেক্ষা করে ও প্রতিশোধের ডাক দিয়ে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের অনুগত ইরানি নাগরিকরা আজ বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) দেশটির প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির নিজ শহর মাশহাদে তার দাফন অনুষ্ঠানের জন্য সমবেত হয়েছে।
গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রথম দিনে ইসরায়েলি হামলায় আলী খামেনি নিহত হন। এর ফলে সাড়ে তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা তার শাসনের অবসান ঘটে। খবর বার্তা সংন্থা এএফপির।
আলী খামেনির দাফন অনুষ্ঠানকে ঘিরে ইরানের শিয়া মুসলিমদের অন্যতম পবিত্র স্থান হিসেবে পরিচিত পূর্বাঞ্চলীয় শহর মাশহাদের রাস্তায় হাজার হাজার মানুষ জড়ো হয়েছে।
গত মাসে যুদ্ধ শেষ করার চুক্তি হওয়া সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন করে শত্রুতা শুরু হওয়ায়, একটি যুদ্ধবিমান মরহুম ইরানি নেতার কফিন বহনকারী বিমানটিকে মাশহাদ পর্যন্ত পাহারা দিয়ে নিয়ে যায়।
ছয় দিনব্যাপী দীর্ঘ অনুষ্ঠানের চূড়ান্ত পর্ব হবে এই দাফন। এর আগে তেহরান, ধর্মীয় কেন্দ্র কোম এবং ইরাকে মানুষ তার প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর সুযোগ পেয়েছে।
এএফপির সংবাদদাতারা জানিয়েছেন, অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়া পুরুষরা কালো শার্ট এবং নারীরা কালো চাদর পরেছিলেন। অনেকেই লাল পতাকা ওড়াচ্ছিলেন, যা শিয়াদের প্রতিশোধের প্রতীক।
মাশহাদে ৪১ বছর বয়সী দোকানদার মোহাম্মদ আফশারিয়ান বলেন, ‘এখানে সবাই প্রতিশোধ নিতে চায়।’ তিনি আরও বলেন, ‘কূটনীতির গল্প কী এবং কূটনীতি চালিয়ে যাওয়ার নীতি কী তা আমি জানি না, তবে সব মানুষ প্রতিশোধের চিহ্ন হিসেবে লাল পতাকা বহন করছে।’
রক্তের নদী বয়ে যাবে
পর্যবেক্ষকরা খামেনির ছেলে ও উত্তরসূরি মোজতবা খামেনির যেকোনো ইঙ্গিতের জন্য নিবিড়ভাবে নজর রাখছেন। তিনি এখনো প্রকাশ্যে কোনো উপস্থিতি দেখাননি এবং জানা গেছে যে, তার বাবাকে হত্যা করা একই হামলায় তিনিও আহত হয়েছিলেন।
মাশহাদের গভর্নর হাসান হোসেইনি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বলেছেন, তিনি আলী খামেনির দাফনে দেড় কোটি মানুষ যোগ দিবে বলে আশা করছেন।
মাজারের কাছে অনেক শিশু উপস্থিত ছিল। অনেকেই তাদের পরিবারের সঙ্গে এসেছে এবং ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের পতাকার রঙের টুপি পরেছে।
মাশহাদে তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছানোর কারণে মুসল্লিদের শরীর ঠান্ডা রাখতে পানি ছিটানোর যন্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছিল।
মাশহাদে 'মিয়ামি' নামের একটি হোটেলের নিচে, একটি বিশাল ব্যানারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি ব্যঙ্গচিত্র দেখানো হয়েছে, যার মাথার জন্য পুরস্কারের ঘোষণা রয়েছে।
অন্য একটি ছবিতে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে দেখানো হয়েছে এবং ইংরেজিতে একটি বার্তা লেখা রয়েছে, যার অর্থ রক্তের নদী বয়ে যাবে।
দাফন অনুষ্ঠানটি মূলত বৃহস্পতিবার সকাল ৬টায় (জিএমটি ০২৩০) শুরু হওয়ার কথা ছিল, তবে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম পরে আয়োজকদের বরাত দিয়ে জানায় যে, ইরাকে অনুষ্ঠান দেরি হওয়ার কারণে এটি দুপুর ২টায় শুরু হবে।
এদিকে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার কারণে রাজধানী থেকে প্রায় ৮০০ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত মাশহাদ ও তেহরানের মধ্যকার রেল যোগাযোগ বন্ধ করতে বাধ্য হতে হয়েছে। তবে আটকে পড়া যাত্রীদের জন্য সড়ক পরিবহনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে বলে রাষ্ট্রীয় রেল কোম্পানি জানিয়েছে।
‘আমাদের শহীদ নেতার জন্য এখানে এসেছি’
সরকারি বার্তা সংস্থা ইরনার তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ইরানের সবচেয়ে শ্রদ্ধেয় উপাসনালয় 'ইমাম রেজা মাজার'-এ খামেনিকে দাফন করা হবে। শিয়াদের ১২ জন ইমামের মধ্যে ইমাম রেজাই একমাত্র ইমাম, যিনি ইরানে সমাহিত আছেন।
নামাজে জানাজার ইমামতি করবেন ১০১ বছর বয়সী আয়াতুল্লাহ এবং ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের রক্ষণশীল ব্যক্তিত্ব হোসেইন নূরী হামেদানী।
খামেনির দাফন অনুষ্ঠানের জন্য এমন কিছু স্থান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল, যা ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ধর্মীয়, রাজনৈতিক এবং আদর্শিক স্তম্ভগুলোকে প্রতিফলিত করে।
আলী খামেনির চিফ অব স্টাফ মোহাম্মদ মোহাম্মদী-গোলপায়েকানি এর আগে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বলেছিলেন, খামেনি নিজেই মাশহাদে সমাহিত হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন।
কয়েক শতাব্দী ধরে এই মাজারে বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে দাফন করা হয়েছে, যার মধ্যে বেশ কয়েকজন সাবেক ইরানি শাহ, পাশাপাশি ২০২৪ সালে হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় নিহত সাবেক প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসিও রয়েছেন।
ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ইরান আশা করছে, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের পর এবং সরকারবিরোধী বিক্ষোভের ওপর দমন-পীড়নের ছয় মাস পর এই অনুষ্ঠানটি তাদের শক্তি ও ঐক্য প্রদর্শন করবে।
মাশহাদের দোকানদার আফশারিয়ান বলেন, ‘আমরা এখানে এসেছি আমাদের শহীদ নেতা সায়্যিদ আলী খামেনি, ইরান বা আমার দেশ, আমার বিশ্বাস, সায়্যিদ মোজতবা খামেনি এবং ইরানের অস্তিত্বের জন্য—যা হাজার হাজার বছরের পুরোনো এক সভ্যতার প্রতীক।’
আলী খামেনিকে তার শিশু নাতনি, জামাতা, কন্যা এবং মোজতবা খামেনির স্ত্রী জাহরা হাদ্দাদ আদেলের সাথে দাফন করা হবে। এরা সবাই ২৮ ফেব্রুয়ারির হামলায় নিহত হয়েছিলেন।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক