শিশুদের জন্য কতটা অনিরাপদ ভারত? উঠে আসছে ভয়াবহ বাস্তবতা
চলতি মাসের এক শনিবার সন্ধ্যায় ভারতের পূর্বাঞ্চলে ১১ বছর বয়সী এক শিশু বন্ধুর জন্মদিনের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে বাড়ি থেকে বের হয়। কিন্তু এরপর আর বড়ি ফেরেনি। স্থানীয় তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, তাকে অপহরণের পর ধর্ষণ করে জীবিত অবস্থায় বস্তায় ভরে পুকুরে ফেলে দেওয়া হয়।
ভারতের চলমান ভয়াবহ যৌন সহিংসতার এটি আরেকটি নৃশংস উদাহরণ। দেশটির ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর (এনসিআরবি) তথ্য অনুযায়ী, সেখানে প্রতিদিন গড়ে ৮০টিরও বেশি ধর্ষণের ঘটনা পুলিশের কাছে নথিভুক্ত হয়। তবে মানবাধিকারকর্মীদের মতে, ভুক্তভোগীদের ওপর দোষারোপ ও সামাজিক লজ্জার কারণে আরও বহু ঘটনা আড়ালেই থেকে যায়।
অধিকাংশ ভারতীয় সমাজে গভীরভাবে প্রোথিত পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা, নারীবিদ্বেষ, পুলিশ বাহিনীর জনবল সংকট এবং বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার ফলে অপরাধীদের মধ্যে পার পেয়ে যাওয়ার একটি সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। এই বিচারহীনতার সংস্কৃতিই যৌন সহিংসতা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে বলে মনে করেন মানবাধিকারকর্মীরা। ২০১২ সালে দিল্লিতে এক শিক্ষার্থীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের পর হত্যার জেরে কঠোর আইন ও দ্রুত বিচার আদালতসহ নানা সংস্কার আনা হলেও, ভারতের দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়নের সমান্তরালে যৌন সহিংসতার পরিস্থিতির তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি।
গত ৫ জুলাই সকালে পশ্চিমবঙ্গের বারুইপুরে আবর্জনাভরা পুকুর থেকে নিখোঁজ ওই ১১ বছর বয়সী শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়া শিশুটির ৪৬ বছর বয়সী বাবা মেয়ের শরীরে কামড়ের দাগ এবং অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি রয়টার্সকে বলেন, আমার মাথা কাজ করছে না। কয়েক দিন ধরে আমি স্বাভাবিকভাবে চিন্তাও করতে পারছি না।
এই ঘটনা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভারতীয় জনতা পার্টিকে (বিজেপি) রাজনৈতিকভাবে চরম চাপে ফেলেছে। কারণ, পশ্চিমবঙ্গে প্রথমবার ক্ষমতায় আসার মাত্র কয়েক মাস আগে তারা নারীদের নিরাপত্তাকেই প্রধান নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি হিসেবে তুলে ধরেছিল। তবে মানবাধিকারকর্মীদের মতে, সমাজে প্রোথিত পিতৃতন্ত্র, পুলিশ ও বিচারব্যবস্থায় লিঙ্গ-সংবেদনশীলতার অভাব এবং বর্ণভিত্তিক বৈষম্যের কারণে শুধু সরকার পরিবর্তন করলেই এই সংকটের সমাধান হবে না।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ভারতে ২৯ হাজার ৫৩৬টি ধর্ষণের মামলা নথিভুক্ত হয়েছে, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোর তুলনায় প্রায় অপরিবর্তিত। তবে শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন অপরাধ গত এক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৪ সালে কেবল পকসো আইনের অধীনেই রেকর্ড ৬৯ হাজার ১৯১টি মামলা হয়েছে।
দেশজুড়ে আরও দুটি আলোচিত ঘটনা
গত এক মাসে অন্তত আরও দুটি ঘটনা ভারতে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। রাজস্থানে ১২ বছর বয়সী এক কিশোরীকে অপহরণ ও মাদক খাইয়ে চার দিন ধরে বিভিন্ন হোটেলে আটকে রেখে একাধিক ব্যক্তি ধর্ষণ করে। পরে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ২২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্যদিকে দিল্লির কাছাকাছি গাজিয়াবাদে সাত বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করে তার মরদেহ নির্মাণাধীন শপিং মলের খালি শ্যাফটে ফেলে রাখা হয়।
ধর্ষণবিরোধী আইন প্রণয়নে ভূমিকা রাখা আইনজীবী করুণা নন্দী বলেন, কোনো সরকারই নারীবিদ্বেষ ও পিতৃতন্ত্রকে সমাজ থেকে উপড়ে ফেলার জন্য সত্যিকার অর্থে কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি। তিনি সামাজিক আচরণ পরিবর্তনের জন্য দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ এবং লিঙ্গ-সংবেদনশীল পুলিশ ও সচেতন বিচারক নিয়োগের ওপর জোর দেন।
প্রশাসনের ব্যর্থতা ও বিশেষ আদালতের ধীরগতি
কলকাতাভিত্তিক নারী অধিকারকর্মী শতাব্দী দাস বলেন, শুধু সরকার বদলালেই কিছু বদলাবে না। এটি ভারতের সর্বত্র গভীরভাবে প্রোথিত পিতৃতান্ত্রিক সংস্কৃতির সমস্যা। সরকার ২০২৬ সালের মধ্যে যৌন অপরাধের বিচার দ্রুত শেষ করতে ২ হাজার ৬০০টি বিশেষ দ্রুত বিচার আদালত গঠনের পরিকল্পনা করলেও, সর্বশেষ সরকারি তথ্য অনুযায়ী এখন পর্যন্ত মাত্র ৭৫৫টি আদালত স্থাপন করা হয়েছে, যার মধ্যে ৪১০টি কেবল পকসো মামলার জন্য নির্ধারিত।
ভারতের জাতীয় মহিলা কমিশন রাজস্থানের ঘটনাটিকে প্রশাসনিক ব্যর্থতা, পুলিশি দুর্বলতা এবং অপর্যাপ্ত নজরদারির স্পষ্ট উদাহরণ বলে উল্লেখ করেছে। যদিও রাজস্থানের জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তা হরিশঙ্কর যাদব দাবি করেছেন, মামলা দায়েরের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই প্রধান অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার এবং শিশুটিকে উদ্ধার করা হয়েছিল।
এদিকে বারুইপুরের নিহত শিশুটির পরিবার অভিযোগ করেছে, নিখোঁজ হওয়ার রাতে পুলিশ তৎপর হলে মেয়েটিকে বাঁচানো যেত। পরিবারের এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু জানান, পুলিশ শুধু কয়েকজন স্থানীয়কে জিজ্ঞাসাবাদ করে নিষ্ক্রিয় ছিল। শেষ পর্যন্ত এলাকাবাসী নিজেরাই সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে তদন্তে সহায়তা করে। বারুইপুরের পুলিশ কর্মকর্তা অরবিন্দ কুমার আনন্দ জানিয়েছেন, এ বিষয়ে একটি অভ্যন্তরীণ তদন্ত চলছে।
ধীরগতির বিচার প্রক্রিয়ার কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে তথাকথিত ‘এনকাউন্টার’ বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের প্রতি সমর্থন বাড়ছে। বারুইপুরের ঘটনায় সন্দেহভাজনকে পুলিশ গুলি করে হত্যা করেছে। পুলিশের দাবি, অভিযুক্ত ব্যক্তি পুলিশ সদস্যদের কাছ থেকে অস্ত্র ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল।
পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি নেতা অগ্নিমিত্রা পাল বলেন, চারজন অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একজন এনকাউন্টারে নিহত হয়েছে। সরকারের বার্তা স্পষ্ট, এ ধরনের অপরাধ কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না।
তবে বিরোধী দল ও মানবাধিকারকর্মীরা এর তীব্র সমালোচনা করেছেন। আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী বৃন্দা গ্রোভার বলেন, সন্দেহভাজনকে পুলিশ গুলি করে হত্যা করা মূলত জনমনে তাৎক্ষণিক সন্তুষ্টি দেওয়ার একটি প্রদর্শনী। এতে মনে হতে পারে দ্রুত বিচার হয়েছে, কিন্তু এতে অপরাধ কমে না। বরং এটি পুলিশ ও রাষ্ট্রের ইচ্ছামতো ক্ষমতা প্রয়োগের প্রবণতাকে আরও উৎসাহিত করে।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক