বন্যায় বিধ্বস্ত চীনের সীমান্ত অঞ্চলে শত শত মানুষের ভাগ্য এখনও অজানা
চীন ও নেপাল সীমান্তের অন্যতম ব্যস্ত বাণিজ্যিক কেন্দ্র ছিল ‘জিরোং পোর্ট’। আকস্মিক বন্যা ও ভয়াবহ কাদা-ধসে পোর্টটি এখন পুরোপুরি মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। ধসে যাওয়া পাথর, কাঁকর আর কাদার বিস্তীর্ণ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া এ অঞ্চলে বহু মানুষের সলিলসমাধি ঘটেছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ঘটনার পর ১১ দিন পার হয়ে গেলেও চীনের অভ্যন্তরে এখনও শত শত মানুষের কোনো খোঁজ মেলেনি।
আজ রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) চীন সরকারের আয়োজিত পরিদর্শনের অংশ হিসেবে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সিএনএনএর প্রতিনিধি দল সরেজমিনে গিয়ে এই প্রলয়ঙ্করি ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র প্রত্যক্ষ করে।
গত ২৬ আগস্ট নেপালের ল্যাংটাং লিরুং পর্বতের হিমবাহে ফাটল ধরে ধস নামলে নদী অববাহিকায় বাঁধের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়। একপর্যায়ে আকস্মিক বন্যা ও কাদা-ধসের সৃষ্টি হয়। পাহাড় থেকে তীব্র বেগে নেমে আসা পানির ঢেউ প্রথম আঘাত হানে চীন সীমান্তের পাঁচতলা বিশিষ্ট সীমান্ত চেকপয়েন্ট ও প্রশাসনিক ভবনে। ভয়াবহ সেই সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, পানির প্রবল স্রোত ধেয়ে আসার সময় মানুষ জীবন বাঁচাতে মরিয়া হয়ে ছুটছিল।
বর্তমানে মূল পাঁচতলা ভবনের আর কোনো অস্তিত্ব নেই; খননকাজের পর কেবল এর ভিত্তির অংশটুকুই দেখা যাচ্ছে। দুর্ঘটনাস্থলে কোনো জীবিত মানুষকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। চেকপয়েন্ট ভবনের পাশাপাশি ট্রাভেল এজেন্সি, সুপারমার্কেট এবং চীন-নেপাল সংযোগকারী সেতুটি পুরোপুরি ধসে কাদার নিচে চাপা পড়েছে।
রোববার সন্ধ্যায় প্রকাশিত চীনের সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, দেশটির সীমান্তে ৪৩ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে। এখনও নিখোঁজ রয়েছেন ৫১৯ জন। তিব্বত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের প্রশাসনিক ভাইস প্রেসিডেন্ট রেন ওয়েই জানিয়েছেন, নিখোঁজদের মধ্যে অন্তত ২৬১ জন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন। দুই দেশের সীমানা মিলিয়ে এই ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগে মৃতের সংখ্যা ইতোমধ্যে হাজার ছাড়িয়ে গেছে। আরও হাজার হাজার মানুষ এখনও নিখোঁজ।
চীনের পক্ষ থেকে নিখোঁজদের নামের তালিকা প্রকাশ না করায় নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবার ও আন্তর্জাতিক মহলে তথ্যের স্বচ্ছতা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। তবে তিব্বত কর্তৃপক্ষের দাবি, তারা শুরু থেকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে প্রতিটি জীবনের তথ্য যাচাই করছেন।
তিব্বতের জননিরাপত্তা বিভাগের নির্বাহী উপপরিচালক পু ওয়েইদং জানান, নিহতদের পরিচয় শনাক্তকরণের জন্য ৬০ জনেরও বেশি বিশেষজ্ঞ এবং তিনটি ল্যাবরেটরি সার্বক্ষণিক কাজ করছে। উদ্ধারকৃত অবশিষ্টাংশ, আঙুলের ছাপ, জিনগত তথ্য (ডিএনএ) ও ইমিগ্রেশন রেকর্ড বিশ্লেষণ করে নিখোঁজ ব্যক্তিদের তালিকা মেলানো হচ্ছে। বিদেশি নিখোঁজদের তথ্য স্ব-স্ব রাষ্ট্রদূত বা দূতাবাসে পাঠানো হয়েছে।
উদ্ধারকর্মীরা জানান, ঘটনার পরপরই পুরো সড়ক যোগাযোগ ভেসে যাওয়ায় প্রায় এক সপ্তাহ উদ্ধারকারী দলগুলোকে পাহাড়ি পথ হেঁটে বা আকাশপথে মূল কেন্দ্রে পৌঁছাতে হয়েছে। গত বুধবার সড়ক আংশিক পরিষ্কার হওয়ার পর ভারী যন্ত্রপাতি উদ্ধারকাজে যুক্ত হতে পেরেছে। উদ্ধারকারী দলের প্রধান ইয়াং কিচিয়াও এবং কর্মী ঝাং জিয়াওজুন জানান, কাদা, নুড়ি পাথর, নতুন করে ভূমিধস এবং নদীর ওপর প্রাকৃতিক বাঁধ (ব্যারিয়ার লেক) ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকিসহ প্রতিকূল পরিবেশ উদ্ধারকাজকে অত্যন্ত কঠিন করে তুলেছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে হিমবাহে নতুন করে ধস নামার ঝুঁকি আরও বাড়ছে। তবে এই মুহূর্তে উদ্ধারকারীদের মূল অগ্রাধিকার কাদার স্তর সরিয়ে নিখোঁজদের মৃতদেহের জন্য সন্ধান চালানো।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক