ইরানকে ‘নরক’ বানানোর হুমকি দিয়েও নভেম্বরে চুক্তির আশা ট্রাম্পের
নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন চলাকালে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও জামাতা জ্যারেড কুশনার। মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের বিষয়টিতে জোর দেন।
ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ‘আমাকে একটি বড় সিদ্ধান্ত নিতে হবে—ইরানের সঙ্গে এমন কোনো চুক্তি করা সম্ভব হবে কি না, যা তাদের পুনর্গঠিত হতে এবং আরও উন্নত ও শক্তিশালী দেশ হিসেবে গড়ে উঠতে সহায়তা করবে?’
৮০ বছর বয়সী ট্রাম্পের এ ভাষণের সময় ইরানি প্রতিনিধি দলের একজন ছাড়া বাকি সবাই অধিবেশন কক্ষ থেকে বেরিয়ে যান।
ট্রাম্প আরও বলেন, ‘নাকি আমি ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে (ইরান) ধ্বংস করে দেব এবং তা করব দ্রুত, যাতে তারা আর কখনোই মানুষ হত্যা ও কোনো দেশকে ধ্বংস করার সুযোগ না পায়? আমি কি তাদের এমন এক নরকের দিকে ঠেলে দেব, যেখান থেকে বেঁচে ফেরার কোনো সুযোগ থাকবে না?’
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, তার বিশ্বাস নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর পরই ইরান চুক্তিতে সম্মত হবে।
এ নির্বাচনের মাধ্যমে রিপাবলিকানরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে, যার অন্যতম কারণ হলো মার্কিন অর্থনীতির ওপর এই যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব।
ভাষণের পর পরই ট্রাম্প জানান, জাতিসংঘ অধিবেশনের ফাঁকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের মধ্যে তিন ঘণ্টা ধরে বৈঠক হয়েছে।
অপরদিকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে সাক্ষাতের সময় ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, তাদের মধ্যে খুব ভালো ও ফলপ্রসূ একটি বৈঠক হয়েছে। খুব শিগগিরই তাদের আরেকটি বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
পরবর্তীতে জাতিসংঘের অধিবেশনে উপসাগরীয় অঞ্চলের নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় ট্রাম্প আরও বলেন, আমার মনে হয়, তাদের চুক্তিতে আসার ব্যাপারে বেশ জোরালো গতি সঞ্চার হয়েছে। সবার কাছ থেকে আমরা এমনটাই শুনেছি।
ইরানি গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে আরাঘচি ট্রাম্পের বিশেষ দূত উইটকফের কাছে কিছু শর্ত তুলে ধরেছেন।
রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরআইবির তথ্যমতে, আরাঘচির জানানো শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে—(যুক্তরাষ্ট্রের) নৌ-অবরোধ অবিলম্বে প্রত্যাহার করা, ইরানের জব্দকৃত সমস্ত সম্পদ দ্রুত ফেরত দেওয়া এবং সব প্রতিরোধ ফ্রন্টে যুদ্ধের অবসান ঘটানো।
ইরানি প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকের বিষয়ে বিশেষ দূত উইটকফ সাংবাদিকদের বলেন, এই মুহূর্তে আমার খুব ভালো অনুভূতি হচ্ছে। তবে তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি।
গত জুনে সুইজারল্যান্ডে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সঙ্গে তেহরানের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের বৈঠকের পর ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের মধ্যে এটি প্রথম সরাসরি সাক্ষাৎ। চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যখন যুদ্ধ শুরু করেছিল, তখন ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন—চার বা পাঁচ সপ্তাহের মধ্যেই যুদ্ধ শেষ হয়ে যাবে; কিন্তু সেই সংঘাত এখন ষষ্ঠ মাসে গড়িয়েছে।
গত এপ্রিল মাসে সম্মত হওয়া যুদ্ধবিরতি দ্রুতই ভেস্তে যায় এবং এরপর থেকে আলোচনা থমকে আছে, কারণ ইরান হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ছাড়তে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম অত্যাধিক বেড়ে যাওয়ায় ভোটারদের ক্রমবর্ধমান ক্ষোভের মুখে রয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তবুও যুদ্ধের যৌক্তিকতা প্রমাণের চেষ্টা করে ট্রাম্প বলেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সুযোগ দেওয়া যেতে পারে না।
জাতিসংঘ অধিবেশনে দেওয়া ভাষণের বড় অংশজুড়ে আক্রমণাত্মক সুর থাকলেও ট্রাম্প নিজেকে একজন শান্তি প্রতিষ্ঠাকারী হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে কাজ করছেন বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘অন্যরা যেখানে হুমকিগুলোকে উপেক্ষা করেছে, আমি সেখানে সেগুলোর মোকাবিলা করেছি।’
তবে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন অবসানে ট্রাম্প এখনও কোনো চুক্তি নিশ্চিত করতে পারেননি। অথচ একসময় তিনি দাবি করেছিলেন, মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই এ যুদ্ধের সমাধান করতে পারবেন।
ট্রাম্প জোর দিয়ে বলেন, যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে তিনি উভয় পক্ষের সঙ্গেই কাজ করছেন। যদিও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে আগ্রহী—এমন কোনো লক্ষণ বা প্রমাণ খুব একটা দেখা যায়নি।
জাতিসংঘে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প বলেন, ‘আমার মনে হয়, মানুষ যতটা ভাবছে তার চেয়ে দ্রুতই এটি ঘটতে যাচ্ছে।’
এদিকে, জাতিসংঘ অধিবেশনের ফাঁকে ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্কের সঙ্গে একটি নিরাপত্তা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। এর ফলে ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত এ অঞ্চলটি দখল করে নেওয়ার বিষয়ে তার আগের দাবিগুলোর তীব্রতা আপাতত কমে গেছে।
এই চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চল ও পূর্বাঞ্চলে দুটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করবে এবং আর্কটিক অঞ্চলের এই দ্বীপটিতে ন্যাটো-বহির্ভূত কোনো শক্তির সামরিক উপস্থিতি গড়ে তোলা নিষিদ্ধ করা হবে।
ট্রাম্প বলেন, ‘এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী ও চমৎকার সম্পর্ক হতে যাচ্ছে।’
ক্ষমতায় ফেরার পর গ্রিনল্যান্ডের ওপর ট্রাম্পের আঞ্চলিক মালিকানার দাবি যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যগত মিত্রদেশগুলোকে গভীর উদ্বিগ্ন করে তুলেছিল।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক