কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হাতছাড়া
একক সিদ্ধান্তে কি পরমাণু হামলা চালাতে পারবেন ট্রাম্প?
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারালেও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাতে কি থাকবে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডার ব্যবহারের চূড়ান্ত অনুমোদন? কংগ্রেসের সম্মতি ছাড়াই কি তিনি দিতে পারবেন পরমাণু হামলার নির্দেশ? যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান, সামরিক কমান্ড কাঠামো ও পারমাণবিক নীতির আলোকে এসব প্রশ্ন নতুন করে সামনে এসেছে। কারণ, কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ বিরোধীদের হাতে গেলেও প্রেসিডেন্টের কিছু সাংবিধানিক ক্ষমতা অক্ষুণ্ন থাকে- যার মধ্যে রয়েছে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের অনুমোদন দেওয়ার একক কর্তৃত্ব।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রচলিত ব্যবস্থায় পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের অনুমোদন দেওয়ার একক কর্তৃত্ব প্রেসিডেন্টের হাতে। এ সিদ্ধান্তের জন্য তাকে কংগ্রেসের অনুমতি নিতে হয় না। এমনকি প্রতিরক্ষামন্ত্রী বা সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের সম্মতিও বাধ্যতামূলক নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসনাল রিসার্চ সার্ভিসের (সিআরএস) ১১ ডিসেম্বর ২০২৫-এ হালনাগাদ করা ‘অথরিটি টু লঞ্চ নিউক্লিয়ার ফোর্স’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্টের সামরিক সর্বাধিনায়ক হিসেবে সাংবিধানিক দায়িত্ব থেকেই এই একক কর্তৃত্বের উৎপত্তি। তিনি সামরিক কর্মকর্তাদের পরামর্শ নিতে পারেন, তবে চূড়ান্ত অনুমোদনের ক্ষমতা তারই।
কংগ্রেসের অনুমতি কেন প্রয়োজন হয় না?
যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে প্রেসিডেন্টকে দেশটির সামরিক বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে যুদ্ধ ঘোষণা করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে কংগ্রেসকে।
এখানে দুটি বিষয় আলাদা। যুদ্ধ ঘোষণা করার ক্ষমতা কংগ্রেসের হাতে থাকলেও পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়ার জন্য প্রেসিডেন্টকে কংগ্রেসের ভোটের অপেক্ষা করতে হয় না।
ফলে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট- উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ বিরোধী ডেমোক্র্যাটদের হাতে গেলেও ট্রাম্পের পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের অনুমোদন দেওয়ার ক্ষমতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হবে না।
সামরিক কর্মকর্তাদের সম্মতি কি প্রয়োজন?
পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সিদ্ধান্তের আগে প্রেসিডেন্ট সামরিক ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করতে পারেন। প্রতিরক্ষামন্ত্রী, জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান এবং যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্র্যাটেজিক কমান্ডের কর্মকর্তারা সম্ভাব্য পরিস্থিতি ও সামরিক বিকল্প সম্পর্কে তাঁকে পরামর্শ দিতে পারেন।
তবে তাদের সম্মতি পারমাণবিক হামলার নির্দেশ দেওয়ার বাধ্যতামূলক শর্ত নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক স্ট্র্যাটেজিক কমান্ড প্রধান জেনারেল জন হাইটেন কংগ্রেসের শুনানিতে বলেছিলেন, তার দায়িত্ব প্রেসিডেন্টকে পরামর্শ দেওয়া; পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়ার কর্তৃত্ব প্রেসিডেন্টের।
সিআরএসের প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান প্রেসিডেন্টের প্রধান সামরিক উপদেষ্টা হলেও পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের অনুমোদন দেওয়ার চেইন অব কমান্ডে তার আলাদা কোনো সিদ্ধান্তমূলক কর্তৃত্ব নেই।
নির্দেশ দিলেই কি সঙ্গে সঙ্গে হামলা হবে?
বিষয়টি এতটা সরল নয়। যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক অস্ত্র পরিচালনার জন্য রয়েছে বিশেষ কমান্ড, নিয়ন্ত্রণ ও যোগাযোগব্যবস্থা। একে বলা হয় নিউক্লিয়ার কমান্ড, কন্ট্রোল অ্যান্ড কমিউনিকেশনস বা এনসি৩।
এই ব্যবস্থার মাধ্যমে সম্ভাব্য হামলার সতর্কতা ও গোয়েন্দা তথ্য প্রেসিডেন্টের কাছে পৌঁছানো, সামরিক পরামর্শ গ্রহণ এবং অনুমোদিত নির্দেশ সংশ্লিষ্ট বাহিনীর কাছে পাঠানোর ব্যবস্থা রয়েছে।
প্রেসিডেন্টের পরিচয় ও নির্দেশের সত্যতা যাচাইয়ের জন্যও নির্দিষ্ট নিরাপত্তা প্রক্রিয়া রয়েছে। তবে এসব প্রক্রিয়া তার সিদ্ধান্তের বিকল্প নয়; বরং অনুমোদিত সিদ্ধান্ত যেন সঠিকভাবে শনাক্ত ও বাস্তবায়িত হয়, সেটি নিশ্চিত করার অংশ।
সামরিক বাহিনী কি বেআইনি নির্দেশ প্রত্যাখ্যান করতে পারে?
প্রেসিডেন্টের হাতে একক অনুমোদনের ক্ষমতা থাকলেও তিনি আইনবহির্ভূত যেকোনো নির্দেশ দিতে পারেন- এমন নয়।
আন্তর্জাতিক মানবিক আইন অনুযায়ী, সামরিক অভিযানে সামরিক প্রয়োজনীয়তা, আনুপাতিকতা এবং বেসামরিক মানুষ ও সামরিক লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে পার্থক্য করার নীতি মানতে হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সদস্যরাও বৈধ নির্দেশ পালন করতে বাধ্য। কিন্তু কোনো নির্দেশ স্পষ্টতই বেআইনি হলে তা পালন করার বাধ্যবাধকতা নেই। এ ধরনের পরিস্থিতিতে নির্দেশের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে এবং সামরিক কর্মকর্তারা আইনি পরামর্শ নিতে পারেন।
তবে বাস্তবে কোনো পারমাণবিক নির্দেশ বেআইনি কি না, তা নির্ধারণ পরিস্থিতি ও সংশ্লিষ্ট সামরিক লক্ষ্যের ওপর নির্ভর করবে।
প্রথমে পরমাণু হামলা চালানোর ক্ষমতাও কি রয়েছে?
যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক নীতিতে শত্রুপক্ষের প্রথমে পারমাণবিক হামলা চালানোকে অস্ত্র ব্যবহারের বাধ্যতামূলক পূর্বশর্ত হিসেবে ধরা হয় না। অর্থাৎ নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র প্রথমে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের বিকল্পও বিবেচনা করতে পারে।
কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের (সিএফআর) ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫-এ প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট কংগ্রেসের অনুমতি ছাড়াই পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দিতে পারেন। এ ক্ষমতার সঙ্গে প্রথম হামলার বিকল্পও যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যমান নীতির আলোচনায় রয়েছে।
তবে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য সামরিক ও মানবিক পরিণতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি পারমাণবিক হামলা ব্যাপক প্রাণহানি, পরিবেশ বিপর্যয় এবং আন্তর্জাতিক সংঘাতের বিস্তার ঘটাতে পারে।
কংগ্রেস কি ট্রাম্পের এই ক্ষমতা সীমিত করতে পারবে?
কংগ্রেসের হাতে প্রেসিডেন্টের পারমাণবিক নীতির ওপর প্রভাব বিস্তারের বিভিন্ন উপায় রয়েছে। আইন প্রণয়ন, সামরিক বাজেট অনুমোদন, প্রতিরক্ষা ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং প্রশাসনের কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারির মাধ্যমে কংগ্রেস প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে।
এছাড়া পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের কর্তৃত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া পরিবর্তনের জন্য নতুন আইন বা নীতিগত সংস্কারের উদ্যোগ নিতে পারে।
তবে বর্তমান ব্যবস্থায় পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের প্রতিটি নির্দেশের আগে কংগ্রেসের অনুমোদন বাধ্যতামূলক নয়। ফলে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারালেও ট্রাম্পের এই ক্ষমতা বহাল থাকবে।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক