মেঠো পথের বাঁকে গ্রামীণ হাট
শহরের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সুপারশপগুলোতে থরে থরে সাজানো পণ্য থাকতে পারে, কিন্তু সেখানে প্রাণের সেই ছোঁয়াটুকু নেই যা পাওয়া যায় অজপাড়াগাঁয়ের কোনো এক বটতলার হাটে। সপ্তাহের নির্দিষ্ট এক বা দুদিন মেঠো পথের বাঁকে, নদীর ধারে কিংবা বিশাল কোনো বটগাছকে কেন্দ্র করে বসে এই হাট। খুব ভোরে যখন কুয়াশা বা ভোরের আলো ফুটতে শুরু করে, তখন থেকেই শুরু হয় হাঁকডাক।
হাটে এলে দেখা যায় বিচিত্র সব পসরা। একপাশে টাটকা শাকসবজি নিয়ে বসেছেন কৃষক, যার গায়ে লেগে আছে মাটির সোঁদা গন্ধ। অন্যপাশে জেলেদের বড় বড় ডালায় লাফাচ্ছে দেশি মাছ। শুধু কি খাদ্যদ্রব্য? কামার-কুমারের দোকানে সারি সারি দা-বঁটি আর মাটির হাঁড়ি-পাতিল। আরও আছে বাঁশ ও বেতের তৈরি কুলা, ডালা আর বাহারি পাটি। শিশুদের জন্য আলাদা আকর্ষণ হিসেবে থাকে মাটির খেলনা, রঙিন বাতাসা আর মুড়কি-মুড়ির সমাহার।
হাটের আসল সৌন্দর্য কেনাবেচায় নয়, বরং এর সামাজিক গুরুত্বে। হাটে আসা মানুষগুলো শুধু সওদা করতে আসে না, আসে মানুষের খোঁজ নিতে। দীর্ঘদিনের চেনা মুখগুলোর সাথে দেখা হয় এখানেই। বটতলার কোনো এক চায়ের দোকানে বসে চলে গ্রামের রাজনীতির আলোচনা, চাষাবাদের পরামর্শ কিংবা নতুন কোনো আত্মীয়তার গল্প। শহরতলীর মানুষের কাছে এটি স্রেফ বাজার হতে পারে, কিন্তু গ্রামবাসীদের কাছে এটি বিনোদন আর পুনর্মিলনীর এক মিলনমেলা।
গ্রামীণ হাট আমাদের দেশীয় অর্থনীতির শেকড়। ক্ষুদ্র কৃষক থেকে শুরু করে প্রান্তিক কারিগর সবার জীবিকার চাকা ঘোরে এই হাটকে কেন্দ্র করেই। এখানে কোনো মধ্যস্বত্বভোগী নেই, সরাসরি উৎপাদকের কাছ থেকে টাটকা পণ্য পাওয়ার যে তৃপ্তি, তা আর কোথাও মেলা ভার।
সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে অনেক গ্রামেই এখন প্রতিদিন বাজার বসে। গড়ে উঠেছে স্থায়ী দোকানপাট। ফলে আগের মতো সেই ‘হাটে যাওয়ার’ আনন্দ বা উন্মাদনা কিছুটা ম্লান হচ্ছে। তবুও পহেলা বৈশাখ কিংবা বারো মাসের মেলায় যখন হাটগুলো আবার নতুনের সাজে সেজে ওঠে, তখন মনে হয় বাংলার প্রাণ আসলে লুকিয়ে আছে এই লোকজ ঐতিহ্যেই।
গ্রামীণ হাট হলো আমাদের সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। নাগরিক জীবনের ব্যস্ততার মাঝে একটু শান্তির খোঁজে আজও মানুষ ক্ষণিকের জন্য ফিরে যেতে চায় সেই ধুলোবালির হাটে। যেখানে পণ্যের চেয়ে মানুষের মূল্য বেশি, আর কৃত্রিমতার চেয়ে সারল্যই বড়। বাংলার এই ঐতিহ্য বেঁচে থাকুক প্রজন্মের পর প্রজন্ম।

ফিচার ডেস্ক