কনকুস্তাদোর: স্বর্ণলোভ, সাহস ও ধর্মীয় আধিপত্যের ইতিহাস
কনকুস্তাদর। আক্ষরিকভাবে যার অর্থ ‘বিজয়ী’। ইতিহাসে এই শব্দটি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর পরিচয় তুলে ধরতে ব্যবহার হয়নি। শব্দটি এমন এক বিতর্কিত সময়ের প্রতীক, যখন ইউরোপের ছোট ছোট রাজ্যগুলো পৃথিবীর অজানা প্রান্তে ছুটে যাচ্ছিল নতুন ভূমি, নতুন সম্পদ এবং নতুন সাম্রাজ্যের সন্ধানে। স্প্যানিশ শব্দ ‘কনকুইস্তাদোর’ মূলত সেইসব সৈনিক, অভিযাত্রী ও ভাগ্যান্বেষীদের জন্য ব্যবহৃত হয়, যারা পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতকে আমেরিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চল জয় করে স্পেনের জন্য বিশাল এক উপনিবেশিক সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিল।
ইতিহাসের পাতায় কনকুস্তাদররা কারও কাছে সাহস, দুঃসাহস ও অভিযাত্রিক মনোভাবের প্রতীক; আবার কারও কাছে লোভ, হত্যাযজ্ঞ ও সাম্রাজ্যবাদের নির্মম মুখ। যে সাম্রাজ্যবাদ স্থায়ীত্ব পেয়েছিল ধর্ম উন্মাদনার মধ্য দিয়ে, ধর্মোন্মত্ততার পতাকাকে সামনে রেখে। তাদের হাত ধরেই ইউরোপীয় শক্তিগুলো নতুন পৃথিবীতে আধিপত্য বিস্তার করে, কিন্তু একইসঙ্গে তাদের পদচারণায় ধ্বংস হয়ে যায় বহু প্রাচীন সভ্যতা, নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় অসংখ্য সংস্কৃতি, আর মৃত্যুর মুখে পতিত হয় লক্ষ লক্ষ মানুষ।
কনকুস্তাদরদের আবির্ভাবের পেছনে ছিল ইউরোপের পরিবর্তিত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা। ১৪৯২ সালে স্পেনে মুসলিম শাসনের অবসান ঘটিয়ে রিকনকোয়েস্টা সম্পন্ন হয়। দীর্ঘ যুদ্ধ শেষে অসংখ্য সৈনিক ও ক্ষুদ্র অভিজাত শ্রেণির মানুষ নিজেদের জন্য নতুন কর্মক্ষেত্র খুঁজছিল। সেই বছরই ক্রিস্টোফার কলম্বাস আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে আমেরিকায় পৌঁছানোর পর ইউরোপীয়দের সামনেও নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। ফলে যুদ্ধ পরবর্তী কর্মহীনদের কাছে নতুন পৃথিবীর মতো সুযোগ এনে দেয় এই ঘটনা। বাড়তে থাকে কনকুস্তাদোর সংখ্যা।
ইতিহাস বলছে, অনেক কনকুস্তাদোরই ছিলেন দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে আসা। কেউ কেউ ছিলেন অবৈধ সন্তান। ফলে উত্তরাধিকার সূত্রে জমি বা সম্পত্তি পাওয়ার সুযোগ ছিল না তাদের। ইউরোপে সামাজিক উন্নতির পথ ছিল সীমিত। ফলে আটলান্টিকের ওপারে নতুন বিশ্ব তাদের জন্য অপেক্ষা করছিল। তাদের কেউ কেউ সেই বিশ্বের দিকেই চোখ রাখলো। তারা সাহস, শক্তি ও ভাগ্যের জোরে ধনী ও ক্ষমতাবান হয়ে ওঠার স্বপ্নে অজানা সমুদ্রপথকে বেছে নিলো। যদিও সম্পদের লোভই একমাত্র কারণ ছিল না। ধর্মও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
মধ্যযুগীয় ইউরোপের মানুষ নিজেদের খ্রিস্টধর্মের রক্ষক মনে করত। ফলে নতুন ভূমিতে খ্রিস্টধর্ম প্রচারকে তারা একটি পবিত্র দায়িত্ব হিসেবেও দেখত। বাস্তবে অবশ্য ধর্মপ্রচার, সম্পদ আহরণ এবং সাম্রাজ্য বিস্তার—এই তিনটি উদ্দেশ প্রায়শই একে অপরের সঙ্গে মিশে গিয়েছিল।
ইতিহাসখ্যাত কনকুস্তাদোরদের অন্যতম হার্নান কোরতেস। ১৫১৯ সালে মাত্র কয়েকশ সৈন্য নিয়ে তিনি বর্তমান মেক্সিকোর উপকূলে পৌঁছান। সামনে তখন শক্তিশালী অ্যাজটেক সাম্রাজ্য। রাজধানী তেনোচতিতলান ছিল বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ নগরী। প্রথম দর্শনে এই সাম্রাজ্যকে জয় প্রায় অসম্ভব মনে হয়েছিল। কিন্তু কোরতেস কেবল যুদ্ধের ওপর নির্ভর করেননি। তিনি স্থানীয় বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিদ্যমান বিরোধকে কাজে লাগান। বিশেষ করে ত্লাসকালা জাতির সঙ্গে জোট গঠন করে তিনি অ্যাজটেকদের বিরুদ্ধে শক্তিশালী মিত্র অর্জন করেন। একইসঙ্গে ইউরোপীয় অস্ত্রশস্ত্র, অশ্বারোহী বাহিনী এবং আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে বিজয়ের নতুনত্ব স্বাদ গ্রহণের ইচ্ছে তৈরি করেন। শুরু হয় কঠিন সংঘর্ষ। দুই বছরের মধ্যেই অর্থাৎ, ১৫২১ সালে তেনোচতিতলানের পতন ঘটে এবং অ্যাজটেক সাম্রাজ্যের অবসান হয়। কোরতেসের সাফল্য স্পেনজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে। নতুন পৃথিবীতে সোনা ও সম্পদের গল্প দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ফলে আরও অনেক অভিযাত্রী আমেরিকার দিকে ছুটে আসে। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত ছিলেন ফ্রান্সিসকো পিজারো।
১৫৩২ সালে পিজারো পেরুতে অভিযান শুরু করেন। তখন ইনকা সাম্রাজ্য ছিল দক্ষিণ আমেরিকার সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র। দুর্ভাগ্যবশত ইনকাদের মধ্যে তখন গৃহযুদ্ধ চলছিল। দুই প্রতিদ্বন্দ্বী শাসকের সংঘর্ষে সাম্রাজ্য দুর্বল হয়ে পড়েছিল। পিজারো এই সুযোগকে কাজে লাগান। মাত্র ১৮০ জন সৈন্য নিয়ে তিনি ইনকা সম্রাট আতাহুয়ালপাকে বন্দি করতে সক্ষম হন, যা ইতিহাসের অন্যতম বিস্ময়কর ঘটনাগুলোর একটি। সম্রাটের মুক্তিপণের বিনিময়ে বিপুল পরিমাণ সোনা ও রূপা সংগ্রহ করা হলেও শেষ পর্যন্ত আতাহুয়ালপাকে হত্যা করা হয়। এরপর কুসকো দখল করে ইনকা সাম্রাজ্যের পতন নিশ্চিত করা হয়।
কনকুস্তাদোরদের সাফল্যের পেছনে ইউরোপীয় অস্ত্রশস্ত্র বড় ভূমিকা পালন করেছিল। তাদের হাতে ছিল ইস্পাতের তলোয়ার, ক্রসবো, আরকেবাস নামের প্রাথমিক আগ্নেয়াস্ত্র এবং কামান। পাশাপাশি যুদ্ধপ্রশিক্ষিত ঘোড়া ও কুকুরও ব্যবহৃত হতো। আমেরিকার অধিকাংশ জনগোষ্ঠীর কাছে এসব প্রযুক্তি সম্পূর্ণ অপরিচিত ছিল। তবে শুধু অস্ত্রের শ্রেষ্ঠত্ব দিয়ে কনকুস্তাদোরদের সাফল্য ব্যাখ্যা করা যায় না। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর পারস্পরিক শত্রুতা, রাজনৈতিক বিভাজন এবং ইউরোপীয় রোগের প্রভাবও ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে গুটিবসন্ত, হাম ও ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো রোগ আমেরিকার আদিবাসীদের মধ্যে ভয়াবহ মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যেসব রোগের বিরুদ্ধে ইউরোপীয়দের কিছুটা প্রতিরোধক্ষমতা ছিল, সেসব রোগ আমেরিকার মানুষের কাছে ছিল সম্পূর্ণ নতুন। অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন, যুদ্ধের চেয়ে রোগই আমেরিকার জনসংখ্যা হ্রাসের সবচেয়ে বড় কারণ ছিল। মেক্সিকোতে কয়েক দশকের মধ্যে জনসংখ্যা কোটি কোটি কমে যায়। একই চিত্র দেখা যায় মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চলে। ফলে বহু সমাজ ও সংস্কৃতি কার্যত ভেঙে পড়ে।
বিজয়ের পর কনকুস্তাদোরদের প্রধান লক্ষ্য ছিল সম্পদ আহরণ। সোনা, রূপা, পান্না, মুক্তা—যা কিছু মূল্যবান, সবই তারা সংগ্রহ করত। অসংখ্য শিল্পকর্ম ও ধর্মীয় নিদর্শন গলিয়ে ধাতু হিসেবে ইউরোপে পাঠানো হয়। ষোড়শ শতকের শেষ নাগাদ আমেরিকা থেকে বিপুল পরিমাণ রূপা ও সোনা স্পেনে পৌঁছায়, যা ইউরোপের অর্থনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলে। তবে কনকুস্তাদোরদের নিজেদের মধ্যেও বিরোধ কম ছিল না। সম্পদ বণ্টন, ক্ষমতার ভাগাভাগি এবং রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে তারা প্রায়ই সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ত। ফ্রান্সিসকো পিজারো ও দিয়েগো দে আলমাগ্রোর দ্বন্দ্ব শেষ পর্যন্ত গৃহযুদ্ধে রূপ নেয়। সেই সংঘর্ষের ধারাবাহিকতায় পিজারো ১৫৪১ সালে নিহত হন।
কনকুস্তাদোরদের কার্যক্রম নিয়ে সমালোচনাও দ্রুত শুরু হয়। স্পেনের মধ্যেই অনেক ধর্মযাজক ও চিন্তাবিদ তাদের নৃশংসতার বিরুদ্ধে কথা বলতে শুরু করেন। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত ছিলেন বার্তোলোমে দে লাস কাসাস। তিনি আমেরিকার আদিবাসীদের ওপর সংঘটিত নির্যাতনের বিবরণ লিপিবদ্ধ করেন এবং স্পেনীয় কর্তৃপক্ষের কাছে সংস্কারের দাবি জানান। কারণ, কনকুস্তাদোরদের অভিযানে ধর্ম একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও তা সবসময় মানবিক বা শান্তিপূর্ণ ছিল না। অনেক ক্ষেত্রে খ্রিস্টধর্ম প্রচারের নামে স্থানীয় ধর্ম, সংস্কৃতি ও বিশ্বাসকে অবজ্ঞা করা হয়। আদিবাসীদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানকে ‘বর্বর’ বা ‘শয়তানের কাজ’ হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের ওপর জোরপূর্বক ধর্মান্তরের চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল। বহু মন্দির, ধর্মীয় নিদর্শন ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ধ্বংস করা হয়, প্রাচীন পাণ্ডুলিপি পুড়িয়ে ফেলা হয় এবং স্থানীয় ঐতিহ্য নির্মূলে চেষ্টা চালানো হয়। ধর্মীয় শ্রেষ্ঠত্ববোধ অনেক সময় সামরিক আগ্রাসন ও দখলদারির নৈতিক বৈধতা তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। ফলে খ্রিস্টধর্ম প্রচারের আদর্শিক লক্ষ্য বাস্তবে প্রায়শই সহিংসতা, সাংস্কৃতিক ধ্বংস এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ওপর নিপীড়নের সঙ্গে মিশে গিয়েছিল।
ধর্মযাজক ও চিন্তাবিদদের চাপে ১৫৪২ সালে স্পেন নতুন আইন প্রণয়ন করে, যার লক্ষ্য ছিল আদিবাসীদের কিছু অধিকার নিশ্চিত করা। যদিও বাস্তবে এসব আইন সবসময় কার্যকর হয়নি, তবুও এটি ছিল কনকুস্তাদোরদের ক্ষমতা সীমিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
ধীরে ধীরে স্পেন বুঝতে পারে যে সাম্রাজ্য পরিচালনার জন্য কেবল সৈনিক যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দক্ষ প্রশাসক, বিচারক, কর আদায়কারী এবং স্থায়ী বসতি স্থাপনকারী। ফলে কনকুস্তাদোরদের জায়গা নিতে শুরু করে নতুন এক প্রশাসনিক ব্যবস্থা। যারা একসময় সাম্রাজ্য বিস্তারের অগ্রভাগে ছিল, তারা ক্রমেই প্রান্তিক হয়ে পড়ে। তবুও তাদের উত্তরাধিকার অস্বীকার করা যায় না। তাদের অভিযানের ফলে বিশ্বের মানচিত্র বদলে যায়। ইউরোপ, আমেরিকা, আফ্রিকা এবং এশিয়ার মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি পায়। নতুন বাণিজ্যপথ গড়ে ওঠে। কৃষি, খাদ্য, প্রাণী ও প্রযুক্তির বৈশ্বিক বিনিময় শুরু হয়, যা ইতিহাসে ‘কলম্বিয়ান এক্সচেঞ্জ’ নামে পরিচিত। কিন্তু এই পরিবর্তনের মূল্যও ছিল ভয়াবহ। অসংখ্য আদিবাসী সমাজ ধ্বংস হয়ে যায়, বহু ভাষা ও সংস্কৃতি হারিয়ে যায়, আর লাখো মানুষের জীবন বিপর্যস্ত হয়। তাই কনকুস্তাদোরদের ইতিহাসকে বিজয়ের ইতিহাস হিসেবে কল্পনা করা হয় না। এটি একইসঙ্গে ধ্বংস, লোভ, সাহস, ধর্ম, সাম্রাজ্যবাদ এবং মানবিক ট্র্যাজেডির ইতিহাস। আজও কনকুস্তাদোরদের নিয়ে বিতর্ক থামেনি। কেউ তাদের মহান অভিযাত্রী হিসেবে স্মরণ করে, কেউ আবার তাদের গণহত্যা ও উপনিবেশবাদের প্রতীক হিসেবে দেখে। সম্ভবত সত্যটি এই দুই চিত্রের মাঝামাঝি কোথাও অবস্থান করে। আমার মতে, তারা ছিলেন সাহসী ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী, নির্মম ও লোভী। তবে ইতিহাসবিদ ও লেখক মার্ক কার্টরাইটের মতো একটি বিষয়ে আমার কোনো দ্বিমত নেই যে, কনকুস্তাদোরদের পদচারণা মানব ইতিহাসের গতিপথকে স্থায়ীভাবে পরিবর্তন করে দিয়েছিল।

সৈয়দ আহসান কবীর