আওয়ামীপন্থী ভুয়া খবরের এআইনির্ভর নেটওয়ার্ক বন্ধ করল অ্যানথ্রপিক
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহার করে বাংলাদেশে স্বয়ংক্রিয় অপপ্রচার ও ভুয়া খবর তৈরির দীর্ঘস্থায়ী নেটওয়ার্ক শনাক্ত করে বন্ধ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় এআই কোম্পানি অ্যানথ্রপিক। মাত্র একজন ব্যক্তির পরিচালনায় ২৯টি অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে এআই ব্যবহার করে দেড় হাজার ভুয়া খবরের শিরোনাম, দেড় হাজার ছবির প্রম্পট এবং তিনশ কাল্পনিক ঘটনার বিবরণ তৈরি করা হচ্ছিল। এসব কনটেন্টের মূল উদ্দেশ্য ছিল কার্যক্রম নিষিদ্ধ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের পক্ষে জনমত গঠন করা। একই সঙ্গে দলটির রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের আক্রমণ করা।
অ্যানথ্রপিকের সেপ্টেম্বর মাসের ‘থ্রেট ইন্টেলিজেন্স রিপোর্টে’ এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে এআই কোম্পানিটি জানায়, তাদের তৈরি বিশ্বখ্যাত এআই মডেল ‘ক্লড’ ব্যবহার করে এই ভুয়া খবরগুলো তৈরি করা হচ্ছিল। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে গণঅভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতার বাইরে থাকায় অ্যানথ্রপিক এটিকে সরকারি প্রচারণা নয়, বরং বিরোধী দলের পক্ষে পরিচালিত কার্যক্রম হিসেবে উল্লেখ করেছে। তবে আওয়ামী লীগ সরাসরি এই নেটওয়ার্ক পরিচালনা বা অর্থায়ন করেছে— এমন কোনো প্রমাণ তদন্তে পাওয়া যায়নি।
গাইবান্ধার এক ব্যক্তি ও ২৯টি ক্লড অ্যাকাউন্ট
অ্যানথ্রপিকের তদন্তে উঠে এসেছে, পুরো কার্যক্রমটি বাংলাদেশের গাইবান্ধা জেলার একজন ব্যক্তি এককভাবে পরিচালনা করছিলেন। প্ল্যাটফর্মের শনাক্তকরণ এড়ানো এবং ব্যবহারের সীমা অতিক্রম করতে তিনি দীর্ঘ ১৬ মাস ধরে ২৯টি ক্লড অ্যাকাউন্ট ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে ব্যবহার করেন।
ওই ব্যক্তি “ফেইক_নিউজ_থ্রি_ডটপাই” নামে পাইথন ভাষায় লেখা একটি নিজস্ব সফটওয়্যার ব্যবহার করতেন। এটি সরাসরি ক্লডের এপিআইয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ব্যাচ আকারে কনটেন্ট তৈরি করত। প্রতিটি ব্যাচে ১৫টি শিরোনাম, তিনটি বিস্তারিত সাজানো খবর এবং ছবি তৈরির জন্য ১৫টি ইংরেজি প্রম্পট থাকত। তৈরি করা কনটেন্টগুলো নির্দিষ্ট ক্লাউড স্টোরেজে জমা হতো এবং সেখান থেকে পরে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অডিও ও ভিডিওতে রূপান্তর করা হতো।
গ্রামাঞ্চলের মানুষকে লক্ষ্য করে ‘গরম ও আক্রমণাত্মক’ খবর
কার্যক্রমটির পরিচালনাকারী অভ্যন্তরীণ যোগাযোগে নিজেকে প্রতারণামূলক কৌশলের বিষয়ে সচেষ্ট বলে দেখিয়েছেন। এমনকি তিনি লিখেছেন, “কেউ জানে না খবরটি ভুয়া।” তার ভাষায়, খবরগুলোকে ‘গরম ও আক্রমণাত্মক’ এবং সহজ ভাষায় লেখা হতো, ‘যাতে গ্রামের মানুষও বুঝতে পারে’।
অ্যানথ্রপিক জানিয়েছে, ওই ব্যক্তি বিশেষভাবে বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলের আওয়ামী লীগ সমর্থকদের লক্ষ্য করেছিলেন, যাদের পড়াশোনার সুযোগ তুলনামূলকভাবে সীমিত বলে তিনি ধরে নিয়েছিলেন।
যে ধরনের সাজানো বর্ণনা ছড়ানো হতো
এই অপপ্রচার নেটওয়ার্কের তৈরি সব কনটেন্টই আওয়ামী লীগপন্থি ছিল এবং প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তির বিরুদ্ধে নানাবিধ গুরুতর অভিযোগ আনা হতো-
উগ্রবাদ ও শরিয়া শাসন : বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক কমিটির (বর্তমানে জাতীয় নাগরিক পার্টি) বিরুদ্ধে তালেবানধাঁচের শাসনব্যবস্থা ও শরিয়া আইন চালুর পরিকল্পনার কাল্পনিক অভিযোগ আনা হয়।
সহিংসতা ও হত্যাচেষ্টা : অন্তর্বর্তী সরকার এবং ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের লক্ষ্য করে ভুয়া হত্যাচেষ্টা ও বিশেষ ‘অ্যাটাক স্কোয়াড’ তৈরির মতো নাটকীয় গল্প সাজানো হয়।
বিদেশি এজেন্ট : জুলাই আন্দোলনের সমন্বয়ক ও ছাত্র নেতাদের বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার এজেন্ট হিসেবে চিত্রায়িত করা হয়।
দুর্নীতি ও গোপন আঁতাত : প্রতিপক্ষ দলগুলোর মধ্যে গোপন রাজনৈতিক জোট ও আর্থিক দুর্নীতির মিথ্যা খবর ছড়ানো হয়।
ভূরাজনৈতিক অবস্থান : কিছু বর্ণনায় ভারতের ভূরাজনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কথা বলা হলেও এর পেছনে কোনো রাষ্ট্রের নির্দেশনা বা অর্থায়নের প্রমাণ মেলেনি।
স্বয়ংক্রিয় আপলোড ব্যবস্থা ও সামাজিক মাধ্যমে উপস্থিতি
পরিচালনাকারী একটি পৃথক আপলোড স্ক্রিপ্ট তৈরি করেছিলেন, যা ইউটিউবের এপিআই ব্যবহার করে একসাথে বিপুল পরিমাণ ভিডিও স্বয়ংক্রিয়ভাবে আপলোড করতে পারত। থার্ড-পার্টি সমন্বয় সেবার মাধ্যমে আইপি ঠিকানা আড়াল করে এক মাস আগেই ভিডিও প্রকাশের সময়সূচি ঠিক করে রাখা যেত। পরবর্তীতে এসব ভিডিও দিয়ে ফেসবুক লাইভ, ইউটিউব ও টিকটক লাইভস্ট্রিমে প্রচারণা চালানোর পরিকল্পনা ছিল।
অ্যানথ্রপিক এই কার্যক্রমকে তাদের ‘ব্রেকআউট স্কেল’ অনুযায়ী ‘ক্যাটেগরি থ্রি’ হিসেবে মূল্যায়ন করেছে। এর মানে হলো, উৎপাদিত কনটেন্ট একাধিক প্ল্যাটফর্মে কয়েকটি অ্যাকাউন্ট ও চ্যানেলে ছড়িয়ে পড়েছে। তবে এসব কনটেন্ট নির্ধারিত অ্যাকাউন্টগুলোর বাইরে খুব বিস্তৃত দর্শকের কাছে পৌঁছেছিল কিনা, তার প্রমাণ মেলেনি।
অ্যাকাউন্ট নিষিদ্ধ
ঘটনাটি শনাক্ত করার পর অ্যানথ্রপিক উক্ত ২৯টি অ্যাকাউন্ট নিষিদ্ধ করেছে। তবে পরিচালনাকারী আবার নতুন অ্যাকাউন্ট খুলে কার্যক্রম শুরু করতে পারেন— এই আশঙ্কায় আচরণগত বৈশিষ্ট্য শনাক্তকরণের নতুন প্রযুক্তি যুক্ত করেছে কোম্পানিটি। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর সাথে শনাক্তকারী তথ্য শেয়ার করা হয়েছে।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক