এফডিসিতে শুটিং
পরিচালকের পছন্দ অপছন্দ
চলচ্চিত্রে গল্পের সাথে আমরা অনেক বাড়িঘর দেখি। গরিবের বাড়ি, জমিদার বাড়ি, আবার মাস্তানদের আস্তানা। এর বেশির ভাগ অংশের শুটিং করা হয় এফডিসিতেই সেট বানিয়ে। সরকারি এই প্রতিষ্ঠানে স্টুডিওর বাইরে হাতে গোনা কয়েকটি জায়গা শুটিং স্পট হিসেবে ব্যবহার করা হয়। যারা ঢালিউডি ছবির নিয়মিত দর্শক তাদের কাছে এসব জায়গা অতি পরিচিত। তারপরও ঘুরেফিরে এফডিসিতেই সেট ফেলা হয় কেন? এমন প্রশ্নের উত্তরে পরিচালক বদিউল আলম খোকন বলেন- ‘এফডিসিতে সেট বানানোই ভালো।’ পরিচালক খোকনের সঙ্গে এফডিসির ভেতরে কথা হচ্ছিল গত ১৪ জুন, ‘রাজাবাবু’ ছবির শুটিংয়ের সময়। এই ছবির সেট ফেলা হয়েছে এফডিসিতে।
কেন এফডিসিতে শুটিং করা ভালো? জবাবে পরিচালক বদিউল আলম খোকন বলেন, ‘গত মাসে আমরা টাঙ্গাইল গেলাম শুটিং করতে। গিয়ে দেখি সেখানে উন্নয়নমূলক কাজ হচ্ছে। আমার বড় একটা জমিদার বাড়ি দরকার ছিল। এফডিসিতে এসে সেট ফেলে শুটিং করলাম, দুদিন পরই বৃষ্টিতে সেট ভেঙে পড়ল। এখন চার নম্বর শুটিং ফ্লোরে সেট বানিয়ে কাজ করছি। বৃষ্টিতে কোনো সমস্যা হবে না। গল্পের প্রয়োজনে আমার একটা জমিদার বাড়ি দরকার, সেই বাড়ির বাইরের অংশটা এখানে বানিয়ে শুটিং করছি। ভিতরের অংশ এর আগেই করেছি উত্তরার একটা বাড়িতে।’

এফডিসিতে সেট ফেলে শুটিং করার পক্ষে আরো যুক্তি তুলে ধরলেন পরিচালক খোকন। তিনি বলেন, ‘এফডিসিতে এভাবে সেট বানিয়ে শুটিং করতে ভালো লাগে, কারণ আমি যে বাড়িটি চাই ঠিক সেই বাড়িটি এখানে বানাতে পারছি। নিজে ছবি এঁকে দিয়ে সেই বাড়িটিতে শুটিং করছি। না হলে তো গল্পের সঙ্গে একটা গ্যাপ থেকে যাবে।’
কিছুদিন আগেই এফডিসিতে আরেকটি ছবির শুটিং হয়। ছবির নাম ‘বাজে ছেলে দ্য লোফার’। এতে একটি টর্চার সেলের দৃশ্য ছিল। সেই দৃশ্যের জন্যই এফডিসিতে সেট সাজানো হয়। ছবিটির পরিচালক আব্দুর রহিম বাবু এফডিসিতে শুটিং প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমার গল্পে যে ধরনের সেট দরকার, সেটি আমি কোথাও খুঁজে না পেয়ে এফডিসিতে বানিয়ে কাজ করেছি। বাংলাদেশে এখনো সর্বোচ্চ সুযোগ-সুবিধা এফডিসিতে আছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় কর্তৃপক্ষের এদিকে কোনো নজর নাই। এখন আমরা যে সহযোগিতা পাচ্ছি, তা এফডিসির জন্ম থেকেই ছিল। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এগিয়ে না যাওয়ায় আমরা পিছিয়ে যাচ্ছি।’
‘রাজাবাবু’ ছবির সেট নির্মাতা কলন্দর বলেন, ‘যেকোনো ধরনের সেট আমরা বানাতে পারি। ফ্লোরে চারতলা বাড়িও বানানো সম্ভব। আইটেম গানের সেট বেশি হয়, ভিলেনদের নির্যাতন কেন্দ্র, আদালত, এমনকি জমিদার বাড়ি থেকে টিনের দোতলা বাড়ি, সবই বানানো যায় এখানে। সেটের ডিজাইনের ওপন নির্ভর করে কত সময় লাগবে। তবে সাধারণত সাত-আটদিন লাগে যেকোনো সেট বানাতে। শুটিং শেষ হলে সেট সরিয়ে নিতে লাগে দুই দিন।’
সেটের উপকরণ সাধারণত কী? এমন প্রশ্নে জবাবে সেট নির্মাতা বলেন, ‘আমরা দেয়াল বানাতে প্রথমে কাঠের একটা ফ্রেম করি, তার ওপর পাটের পাতলা চট দিয়ে ডিজাইনটা দাঁড় করাই। কাগজ লাগিয়ে তার মধ্যে প্রয়োজন মতো রং ব্যবহার করি। বাড়ি, আদালত সবই মোটামুটি একই পদ্ধতিতে তৈরি করি। আলপনা বা কোনো ডিজাইন থাকলে সেটা ককশিট দিয়ে তৈরি করে রং ব্যবহার করা হয়। আমাদের লক্ষ্য থাকে ক্যামেরার ফ্রেমের ভিতরে যেন সব ঠিক থাকে।’
এফডিসিতে সেট বানিয়ে শুটিং করার সুবিধা বেশি, এমনটাই মনে করেন ক্যামেরাম্যান আজহার। তিনি বলেন, ‘চতুরদিকে এত বেশি জায়গা থাকে যে ক্যামেরা ইচ্ছে মতো ঘুরানো যায়। বিভিন্ন দিক থেকে ক্যামেরার ফ্রেম ধরতে চাইলে যত ধরনের সহযোগিতা দরকার তার সবই এখানে আছে। বাইরেও কিছু জায়গা আছে, যেখানে সেট বানিয়ে শুটিং করা যায়, কিন্তু ইচ্ছেমতো ফ্রেম করা যায় না। ওই পরিমাণ জায়গা থাকে না। আর এফডিসি জায়গাটা আমাদের পরিচিত, এখানে কাজ করতেও স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি।’

তবে সবাই যে এফডিসিতে সেট বানিয়ে শুটিং করতে পছন্দ করেন তা নয়, তেমনই একজন পরিচালক এফ আই মানিক ও পরিচালক শাহিন সুমন। এফ আই মানিক মনে করেন কৃত্রিম জায়গায় শুটিং করার চেয়ে প্রকৃত লোকেশনে শুট করাই ভালো, এতে বিষয়টি দর্শকের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হয়। মানিক আরো বলেন, ‘সেটে জমিদার বাড়ি বানিয়ে শুটিং করলে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের হাত থেকে বাঁচা যায়, এটা সত্যি। কিন্তু আমি যদি বাড়িটা ঠিক মতো দেখাতে চাই তা হলে আকাশসহ ফ্রেম করতে হবে। যেটা এফডিসির সেটে হবে না। আমার এখানকার লোকেশনগুলো দর্শকদের মুখস্থ, যে কারণে দর্শক দেখে মজা পায় না। আর গল্পের প্রযোজনে বাইরে শুটিং করতেই হয়। আসলে দেখতে হবে গল্প কী চায়।”
পনিরচালক শাহিন সুমন বলেন, “ঈদে আমার ‘লাভ ম্যারেজ’ ছবিটি মুক্তি পেয়েছে। আইটেম গান ছাড়া বাকি সবই আমি এফডিসির বাইরে শুট করেছি। আমার গল্পের প্রযোজনেই বাইরে কাজ করতে হয়েছে। এমনও হয়েছে যে বৃষ্টির জন্য সারা দিন দুটি শট নিতে পেরেছি। আসলে গল্পের প্রয়োজনটা মাথায় রেখে কাজ করতে হবে, কোথায় করলাম- এটা বিষয় না।”

মাজহার বাবু