৬ শিশুর মৃত্যুর জন্য আদ্-দ্বীন হাসপাতাল দায়ী : তদন্ত কমিটি
রাজধানীর আদ্-দ্বীন হাসপাতালে দীর্ঘক্ষণ এসি বন্ধ থাকা ও বিকল্প কোনো ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা না থাকায় বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে যাওয়া এবং কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে যাওয়াসহ ছোট বন্ধ কক্ষে অতিরিক্ত মানুষের উপস্থিতি এবং ব্যবস্থাপনায় চরম অবহেলার কারণে ছয় নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে বলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তদন্তে উঠে এসেছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন গত ৪ জুন জমা দেওয়া হয়েছে। জমা দেওয়া সেই তদন্ত প্রতিবেদনের একটি কপি এনটিভি অনলাইনের কাছে সংরক্ষিত আছে।
এ ঘটনায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন সংবাদ সম্মেলন করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আইনে যতটুকু কঠোর হওয়া সম্ভব, আমরা ততটুকুই যাবো। এবার আর কাউকে মাফ করা হবে না।’
মন্ত্রীর এমন মন্তব্যের পর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়সহ স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে যোগাযোগ করে এনটিভি অনলাইন। আদ্-দ্বীন হাসপাতালের বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা বলেন ‘দ্য মেডিকেল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ (রেগুলেশন) অর্ডিন্যান্স, ১৯৮২’ এর ধারা ১১(২)(খ) অনুযায়ী, পরিদর্শনের পর কোনো বেসরকারি ক্লিনিক আইন লঙ্ঘন করলে ডিরেক্টরেট জেনারেল অব হেলথ সার্ভিসেস (ডিজিএইচএস) ক্লিনিকের লাইসেন্স বাতিল করার আদেশ দিতে পারেন। তবে লাইসেন্স বাতিলের আগে ক্লিনিক মালিককে কারণ দর্শানোর সুযোগ (অপরচুনিটি অব শোয়িং কজ) দিতে হবে।
কর্মকর্তারা বলেন, মন্ত্রণালয় সেই কাজটি করেছে। এরই মধ্যে একটি নোটিশ মন্ত্রণালয় দিয়েছে। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এখনো নোটিশের জবাব দেয়নি। এ ক্ষেত্রে আগামীকাল (৭ জুন) পর্যন্ত সময় আছে। দেখা যাক কী হয়।
এদিকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এমন কঠোর অবস্থান আঁচ করতে পেরেছে আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। ইতোমধ্যে মারা যাওয়া শিশুদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দিতে হাসপাতালটি দেনদরবার করছে বলে অভিযোগ ওঠেছে। আর লাইসেন্স বাতিলের নোটিশকে বেআইনি বলে দাবি করেছে আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। আইনিভাবে বিষয়টি মোকাবিলা করার কথাও বলেছে তারা।
যা আছে তদন্ত প্রতিবেদনে
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তদন্ত প্রতিবেদনটিতে বেরিয়ে এসেছে, ৯০০ বর্গফুটের যে পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডে নবজাতকদের রাখা হয়েছিল, তা ছিল চারপাশ থেকে সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ এবং সেখানে কোনো বিকল্প ভেন্টিলেশন বা আলো-বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা ছিল না। ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত (প্রায় ৫০ জন) মানুষের উপস্থিতিতে রাত ২টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত এসি বন্ধ থাকায় কক্ষটিতে অক্সিজেনের মাত্রা মারাত্মকভাবে কমে যায় এবং কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে নবজাতকদের শ্বাস-প্রশ্বাস ব্যাহত হয়।
সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় ছিল, ঘটনার সময় ওয়ার্ডটিতে কোনো চিকিৎসক উপস্থিত ছিলেন না এবং শিশুরা মুমূর্ষু অবস্থায় চলে গেলেও নার্সরা কোনো চিকিৎসককে ডাকেননি। নার্সদের দায়িত্বে চরম অবহেলা, যথাযথ প্রশিক্ষণের অভাব এবং হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের তীব্র দায়িত্বহীনতা ও ত্রুটিপূর্ণ অবকাঠামোর কারণেই এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটেছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে শিশুদের মৃত্যুর সম্ভাব্য কারণ
যদিও অস্বাভাবিক মৃত্যুর ক্ষেত্রে ময়নাতদন্ত ছাড়া মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ বের করা সম্ভব নয়, তবে পারিপার্শ্বিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ, বিভিন্ন ব্যক্তিদের বক্তব্য/জবাববন্দী থেকে নিন্মলিখিত বিষয়গুলোকে মৃত্যুর কারণ হিসেবে বিবেচনা করা যায়-
ছোট বন্ধ কক্ষে অতিরিক্ত মানুষের উপস্থিতি, দীর্ঘক্ষণ এসি বন্ধ থাকা এবং বিকল্প কোনো ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা না থাকায় বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে যাওয়া এবং কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া, যা নবজাতক শিশুর দীর্ঘ সময় টিকে থাকার পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।
তদন্ত কমিটির সার্বিক মন্তব্য
সরেজমিনে ঘটনাস্থল পরিদর্শন, ভিকটিমের পরিবারের বক্তব্য/জবাববন্দী, হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স ও স্টাফদের বক্তব্য ইত্যাদি পর্যালোচনা ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনায় তদন্ত কমিটি সর্বসম্মতিক্রমে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে যে, মগবাজারস্থ আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে গত ২৭/০৫/২০২৬ তারিখে ভোর রাত আনুমানিক ০৫ টা হতে সকাল ০৯ টার মধ্যে ০৬ (ছয়) জন নবজাতকের আকস্মিক মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় উক্ত হাসপাতালে বর্ণিত সময়ে দায়িত্বরত চিকিৎসক না থাকা ও নার্স, স্টাফ এবং সর্বোপরি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দায়িত্বের অবহেলাজনিত বিষয়টি স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে।
ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা রোধে বেশকিছু সুপারিশ করেছে তদন্ত কমিটি
প্রথমত, হাসপাতাল পরিচালনায় ব্যবহৃত ভবনের উপযুক্ততা নিশ্চিতকরণ এবং যত্রতত্র কাচের কক্ষ নির্মাণ বন্ধ করে জরুরি ‘ইমার্জেন্সি মেডিকেল রেসপন্স’ ব্যবস্থা সক্রিয় করতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ওয়ার্ডে সার্বক্ষণিক চিকিৎসক ও প্রশিক্ষিত সেবিকা নিশ্চিত করার পাশাপাশি রোগীর স্বজনদের অতিরিক্ত উপস্থিতি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। সর্বোপরি, বেসরকারি হাসপাতালের নতুন লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ভবন পরিদর্শন এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের পূর্বানুমতি গ্রহণ বাধ্যতামূলক করার জন্য নীতিগত শর্তারোপের সুপারিশ করা হয়েছে।
কেন লাইসেন্স বাতিল হবে না মর্মে শোকজ
তদন্ত রিপোর্ট পাওয়ার পর বৃহস্পতিবার (৪ জুন) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহের পরিচালক স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দেওয়া হয়েছে। দ্য মেডিকেল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজের বিধান লঙ্ঘন করায় কেন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করা হবে না তা জানতে চেয়ে এই নোটিশ দেওয়া হয়।
পত্র জারির ৭২ ঘণ্টার মধ্যে (৭ জুন বিকেল ৪টার মধ্যে) হাসপাতালটির মালিক ডা. শেখ মহিউদ্দিনকে এই নোটিশের জবাব দিতে বলা হয়েছে। নোটিশে বলা হয়েছে, আদ্-দ্বীন হাসপাতাল পরিচালনায় ‘দ্য মেডিকেল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ (রেগুলেশন) অর্ডিন্যান্স, ১৯৮২’ অধ্যাদেশের বিধানসমূহ যথাযথভাবে পালন করা হয়নি। এই নিয়মের চরম অবহেলার কারণেই ওই ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে বলে তদন্ত কমিটি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে দায়ী সাব্যস্ত করেছে।
দৃষ্টান্ত স্থাপনের জন্য বাতিল হবে লাইসেন্স
এ বিষয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, ‘আমার আইনে যতটুকু কঠোর (হার্ড) হওয়া সম্ভব, আমরা ততটুকুই যাবো। এবার আর কাউকে মাফ করা হবে না।’
লাইসেন্স বাতিলের নোটিশকে বেআইনি দাবি আদ্-দ্বীন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের
ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দেওয়া লাইসেন্স বাতিলের নোটিশকে বেআইনি বলে দাবি করেছে আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
আজ শনিবার (৬ জুন) দুপুরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সিনিয়র অ্যাডভোকেট শিশির মনির এসব কথা জানান।
এই নোটিশের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে তারা। একই সঙ্গে ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং আজীবন ভুক্তভোগী পরিবারের পাশে থাকাসহ সম্মানজনক ক্ষতিপূরণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে হাসপাতালটি।
আইনজীবী শিশির মনির বলেন, লাইসেন্স বাতিল করার জন্য সরকার যে নোটিশ পাঠিয়েছে তা সম্পূর্ণ বেআইনি। আমরা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এমন নোটিশের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নেবো।

ফখরুল ইসলাম (শাহীন)