বাথরুমে কেন বেশি স্ট্রোক ও হার্ট অ্যাটাক হয়?
গোসল করা কিংবা বাথরুম ব্যবহার—দৈনন্দিন জীবনের একেবারে স্বাভাবিক কাজ। কিন্তু কারও কারও ক্ষেত্রে বাথরুমে ঢোকার পর হঠাৎ মাথা ঘোরা, দুর্বল হয়ে পড়া কিংবা জ্ঞান হারানোর মতো ঘটনা ঘটতে পারে। বিশেষ করে বয়স্ক ব্যক্তি, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ বা অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক সমস্যায় ভোগা মানুষের ক্ষেত্রে বাথরুমের কিছু পরিস্থিতি ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
এর পেছনে একটি নির্দিষ্ট কারণকে দায়ী করা যায় না। সকালবেলা সুস্থ শরীরে বাথরুমে ঢুকে হঠাৎ পড়ে যাওয়া বা জ্ঞান হারানোর ঘটনা আমাদের চারপাশে অহরহই ঘটে থাকে। কিন্তু কেন বাথরুমেই স্ট্রোক বা স্ট্রোকের মতো মারাত্মক শারীরিক বিপর্যয়ের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে? চিকিৎসা বিজ্ঞান ও স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনে কাজ করে মানুষের গোসলের ভুল পদ্ধতি, রক্তচাপের দ্রুত তারতম্য এবং বাথরুমের বিশেষ অভ্যন্তরীণ পরিবেশ। বাথরুমে স্ট্রোক হওয়ার আসল বৈজ্ঞানিক কারণ এবং এটি এড়ানোর সঠিক উপায় নিয়ে জেনে নিন।
বাথরুমে স্ট্রোক বা হার্ট অ্যাটাক হওয়ার মূল বৈজ্ঞানিক কারণসমূহ
মাথায় সরাসরি পানি ব্যবহার
আমাদের অনেকেরই স্বভাব হলো গোসল করতে নেমে প্রথমেই বালতি বা শাওয়ার দিয়ে সরাসরি মাথায় ঠান্ডা বা সাধারণ পানি ঢালা। হঠাৎ মাথায় পানি পড়লে আমাদের মস্তিষ্কের সংবেদনশীল স্নায়ু ও রক্তনালীগুলো প্রচণ্ড সংকুচিত হয়ে পড়ে। রক্তনালী সংকুচিত হলে রক্ত চলাচলের পথ সরু হয়ে যায় এবং রক্তচাপ মুহূর্তের মধ্যে এক ধাক্কায় অনেকটাই বেড়ে যায়। এর ফলে মস্তিষ্কের সূক্ষ্ম রক্তনালী ফেটে গিয়ে স্ট্রোক হতে পারে কিংবা রক্ত জমাট বেঁধে রক্তপ্রবাহ বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
শক্ত হয়ে বসে মলত্যাগের চেষ্টা
কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যায় ভুগছেন এমন ব্যক্তিরা হাই বা লো কমোডে বসে পেটে অতিরিক্ত চাপ বা কোঁথ দিয়ে মলত্যাগের চেষ্টা করেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘ভ্যালসালভা ম্যানুভার’ বলা হয়। পেটে ও বুকে প্রচণ্ড চাপ দেওয়ার কারণে হৃদপিণ্ডে রক্ত ফেরায় সাময়িক বাধা তৈরি হয় এবং সাথে সাথে মস্তিষ্কে রক্তচাপ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যায়। বয়স্ক বা দুর্বল রক্তনালীবিশিষ্ট মানুষের ক্ষেত্রে এই অতিরিক্ত চাপের ফলে হঠাৎ রক্তনালী ছিঁড়ে গিয়ে বাথরুমে স্ট্রোক ঘটে।
তাপমাত্রার চরম তারতম্য
বাথরুম সাধারণত ঘরের অন্যান্য জায়গার তুলনায় কিছুটা বেশি ঠান্ডা ও বদ্ধ থাকে। শরীরের পোশাক খোলার পর বাথরুমের ঠান্ডা আবহাওয়া এবং ভেজা মেঝের সংস্পর্শে এলে রক্তনালীগুলো হঠাৎ সংকুচিত হয়। একে ‘থার্মাল শক’ বলা হয়। এতে শরীরের রক্তচাপ সামলাতে হৃদপিণ্ড ও মস্তিষ্কের ওপর অতিরিক্ত ধকল পড়ে, যা স্ট্রোকের পথ প্রশস্ত করে।
ভেজা মেঝে ও পিচ্ছিল পরিবেশ
বাথরুমের পিচ্ছিল টাইলস বা সাবানের ফেনার কারণে হঠাৎ পা পিছলে পড়ে গেলে মাথার পেছনে বড় ধরণের আঘাত লাগতে পারে। হঠাৎ এই মানসিক ও শারীরিক আতঙ্কের কারণে ব্রেনে তীব্র প্রেশার তৈরি হয়, যা স্ট্রোকের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
হঠাৎ সোজা হয়ে দাঁড়ানো
অনেকক্ষণ নিচু হয়ে বসে গোসল করার পর বা কমোড থেকে হঠাৎ দ্রুত সোজা হয়ে দাঁড়ালে মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ সাময়িকভাবে কমে যায়। একে ‘অর্থোস্ট্যাটিক হাইপোটেনশন’ বলা হয়। এর ফলে মাথা ঘুরে মানুষ বাথরুমের শক্ত মেঝেতে পড়ে যেতে পারে।
বাথরুমে স্ট্রোক প্রতিরোধে অত্যন্ত জরুরি কিছু নিয়ম ও সতর্কতা
গোসলের সঠিক নিয়ম
গোসল করার সময় কখনোই প্রথমেই মাথায় পানি ঢালবেন না। নিয়ম হলো প্রথমে পায়ে, তারপর হাঁটু, উরু, পেট, কাঁধ এবং সবশেষে মাথায় আলতো করে পানি ঢালা। এতে শরীরের তাপমাত্রা রক্তনালীর সঙ্গে ধীরে ধীরে মানিয়ে নেওয়ার সময় পায়।
কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করা
প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় ফাইবার বা আঁশযুক্ত খাবার, সবুজ শাকসবজি এবং পর্যাপ্ত পানি রাখুন যাতে বাথরুমে অতিরিক্ত চাপ দিতে না হয়।
বাথরুমের মেঝের সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ
বাথরুমের টাইলস যেন পিচ্ছিল না হয় তা নিশ্চিত করুন। অ্যান্টি-স্লিপ ম্যাট ব্যবহার করা এবং বয়স্ক ব্যক্তিদের হাত ধরে দাঁড়ানোর জন্য ওয়ালে ‘গ্র্যাব বার’ লাগিয়ে নেওয়া উচিত।
ঘরের ভেতর থেকে দরজা বন্ধ না করা
ঘরে বয়স্ক বা হার্টের রোগী থাকলে বাথরুমের দরজা ভেতের থেকে শক্ত করে বন্ধ না করে কেবল হালকাভাবে চাপিয়ে রাখা ভালো, যাতে বিপদ ঘটলে দ্রুত ভেতরে ঢোকা সম্ভব হয়।
খুব ঠান্ডা পানিতে গোসল না করা
শীতকালে বা সকালে গোসল করার সময় অতিরিক্ত ঠান্ডা পানির পরিবর্তে হালকা কুসুম গরম পানি ব্যবহার করা বেশি নিরাপদ।
বাথরুমে স্ট্রোকের ঘটনা হঠাৎ ঘটলেও একটু সতর্ক হলে এবং গোসলের সঠিক পদ্ধতি মেনে চললে এই বিপর্যয় থেকে নিজেকে ও পরিবারের প্রিয়জনকে রক্ষা করা সম্ভব।

ফিচার ডেস্ক