বাঁকা পায়ের জাদুকর গারিঞ্চার অমর কীর্তি
ফুটবল ইতিহাসে এমনকিছু নাম আছে, যাঁরা পরিসংখ্যানের বাইরে গিয়েও মানুষের হৃদয়ের মণিকোঠায় জায়গা করে নিয়েছেন। ব্রাজিলের কিংবদন্তি ম্যানুয়েল ফ্রান্সিসকো দস সান্তোস, বিশ্ব ফুটবলে যিনি গারিঞ্চা নামে পরিচিত। এই ব্রাজিলিয়ান ছিলেন সেই বিরল প্রতিভাদের একজন। দুইবারের বিশ্বকাপজয়ী এই খেলোয়াড়কে ব্রাজিলিয়ানরা স্নেহভরে ডাকত ‘জয় অব দ্য পিপল’।
১৯৩৩ সালে ব্রাজিলের পাও গ্রান্দেতে জন্ম নেওয়া গারিঞ্চার শৈশব কেটেছিল দারিদ্র্য ও সংগ্রামের মধ্যে। জন্মগতভাবে তার দুই পা ছিল অসমান ও বাঁকা আকৃতির। চিকিৎসকদের মতে এমন শারীরিক গঠন নিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপনই কঠিন ছিল। কিন্তু এই সীমাবদ্ধতাই পরবর্তীতে তার সবচেয়ে বড় শক্তিতে পরিণত হয়। তার ড্রিবলিং ছিল চোখধাঁধানো। প্রতিপক্ষ বুঝতেই পারত না তিনি কোন দিকে মুভ করবেন। অসাধারণ গতি, বল নিয়ন্ত্রণ এবং সৃজনশীল ফুটবলের মাধ্যমে তিনি দর্শকদের মুগ্ধ করে রাখতেন।
শৈশব থেকেই তিনি কঠিন বাস্তবতার মধ্যে বড় হন। তার বাবা ছিলেন মদ্যপ। আর গারিঞ্চাও খুব অল্প বয়সেই সেই নেশার দিকে ঝুঁকে পড়েন। ব্যক্তিগত জীবনে ছিল অস্থিরতা, একাধিক সম্পর্ক এবং নানা পারিবারিক জটিলতা। একাধিকবার আইনি সমস্যার মুখেও পড়তে হয়েছে তাকে। তবুও এসব বাধা তার ফুটবল প্রতিভাকে থামাতে পারেনি।
স্থানীয় একটি কারখানার দলে খেলে তিনি নজরে আসেন। পরে বোটাফোগো ক্লাবে যোগ দিয়ে নিজের প্রতিভার অসাধারণ স্বাক্ষর রাখেন। ১৯৫৮ সালে ব্রাজিল জাতীয় দলে অভিষেকের পর তিনি বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পান। তরুণ পেলের সঙ্গে তার জুটি ব্রাজিলকে প্রথম বিশ্বকাপ জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
১৯৬২ বিশ্বকাপে যখন পেলে চোটে পড়েন। তখন পুরো দলের দায়িত্ব এসে পড়ে গারিঞ্চার কাঁধে। তিনি অসাধারণ নৈপুণ্যে ব্রাজিলকে টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জেতাতে নেতৃত্ব দেন। এবং টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের স্বীকৃতি অর্জন করেন।
গারিঞ্চা ব্রাজিলের হয়ে তিনটি বিশ্বকাপ খেলেছেন। জাতীয় দলের জার্সিতে বহু ম্যাচ খেলেছেন। তার খেলায় ছিল এক ধরনের জাদু। যা দর্শকদের বারবার মুগ্ধ করত।
তবে মাঠের বাইরের জীবন ছিল অত্যন্ত বেদনাদায়ক। মদ্যপান, পারিবারিক অস্থিরতা এবং আর্থিক সংকট ধীরে ধীরে তাকে গ্রাস করে। জীবনের শেষ দিকে তিনি নানা সমস্যায় জর্জরিত হয়ে পড়েন। অবশেষে ১৯৮৩ সালে মাত্র ৪৯ বছর বয়সে তিনি নশ্বর পৃথিবী ছেড়ে চলে যান।
তবুও গারিঞ্চা আজও মানুষের মনে বেঁচে আছেন। তিনি মাঠে খেলতে নেমে যেভাবে আনন্দ দিতেন। সেটা মানুষ কখনো ভুলতে পারেনি। ফুটবলকে তিনি সুন্দর করে খেলতেন। আর সেই সৌন্দর্যই তাকে সবার কাছে বিশেষ করে তুলেছে। ব্রাজিলের মানুষের কাছে তিনি এখনও আনন্দ আর সুন্দর ফুটবলের এক বড় প্রতীক।

ক্রীড়া প্রতিবেদক