ইউক্রেনে রুশ হামলার তীব্রতা বৃদ্ধি, যুদ্ধবিরতির আলোচনা স্থগিত

রাশিয়া যুদ্ধবিরতির জন্য বিদ্যমান বেশ কয়েকটি শর্তের সঙ্গে নতুন শর্ত যুক্ত করেছে। এতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রাশিয়ার তেলের ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞার আরোপের হুমকি দিয়েছেন।
গত ২৭ মার্চ রাশিয়ার নতুন পারমাণবিক সাবমেরিন আরখানগেলস্ক পরিদর্শন শেষে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেছেন, ইউক্রেনে একটি অস্থায়ী প্রশাসন প্রতিষ্ঠা করা উচিত, যাতে দেশটি নির্বাচনের দিকে পরিচালিত হয়।
ইউক্রেনের অবস্থানকে দুর্বল করার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে ফেব্রুয়ারিতে আলোচনা শুরুর পর থেকে রাশিয়ার কর্মকর্তারা ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে অসম্মানের চেষ্টা করছেন। এরমধ্যেই ক্রেমলিন ইউক্রেনের বিরুদ্ধে জ্বালানি অবকাঠামোতে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ করে আসছে, যা মস্কো ১৮ মার্চ প্রস্তাব করেছিল, কিন্তু কিয়েভ তাতে সম্মত হয়নি।
রাশিয়া ও ইউক্রেনের কারিগরি দলগুলো যুদ্ধবিরতি চুক্তির অধীনে কী কী সুরক্ষিত থাকবে, তা নির্ধারণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। মঙ্গলবার রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ বলেছেন, তিনি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে ইউক্রেনের মাধ্যমে আঘাতপ্রাপ্ত জ্বালানি স্থাপনাগুলোর একটি তালিকা দেবেন। একদিন পরে ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ জানান, ইউক্রেন আসলে হামলা স্থগিতের বিষয়ে সম্মত হয়নি।
যুদ্ধবিরতির আলোচনায় রাশিয়ার আরও অনেক আপত্তি ছিল। মঙ্গলবার রাশিয়ার উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই রিয়াবকভ এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, মার্কিন নেতৃত্বাধীন যুদ্ধবিরতির আলোচনায় ‘রাশিয়ার মূল দাবির বিষয়ে কোনো কিছু নেই’। এই সংঘাতের মূল কারণ হিসেবে মস্কোর কর্মকর্তারা ন্যাটোর পূর্বমুখী সম্প্রসারণ ও ইউক্রেনে রাশিয়ার সংখ্যালঘুদের প্রতি অন্যায্য আচরণকে সংজ্ঞায়িত করেছেন।
রাশিয়ার সঙ্গে শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরের পর ইউরোপীয় ইউনিয়ন একটি শান্তিরক্ষী বাহিনী ইউক্রেনের মোতায়েনের প্রস্তাব করেছিল। রাশিয়া যুদ্ধবিরতির জন্য ইউক্রেনে যেকোনো ধরনের শান্তিরক্ষী মোতায়েনের প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছে।
গত বুধবার আর্মেনিয়ায় এক একাডেমিক সম্মেলনে রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত রোডিয়ন মিরোশনিক বলেছেন, রাশিয়া ইউক্রেনে যেকোনো ইউরোপীয় শক্তিকে ‘ইউরোপ কর্তৃক ইউক্রেনের স্পষ্ট দখল’ হিসেবে বিবেচনা করে।
গত রোববার রাশিয়ার অবস্থানের বিষয়ে ট্রাম্পের অধৈর্য হওয়ার প্রথম লক্ষণ দেখা যায়। তিনি সম্প্রচারমাধ্যম এনবিসিকে ফোনে বলেন, তিনি পুতিনের ওপর ক্ষুব্ধ ও বিরক্ত। তিনি আগামী মাসের মধ্যে সমস্ত (রাশিয়ার) তেলের ওপর ২৫ থেকে ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করতে পারেন এবং এটি যেসব কোম্পানিগুলো কিনবে, তাদের জন্য নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করতে পারেন।
রুশ আক্রমণ অব্যাহত
ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতি চুক্তির আলোচনার পরেও রাশিয়া ফ্রন্টলাইনে আক্রমণ বৃদ্ধি করেছে। মার্চে ৪ হাজার ২৭০টি সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে, যেখানে ফেব্রুয়ারিতে ঘতেছিল ৩ হাজার ২৭৪টি।
রাশিয়াও গাইড বোমার ব্যবহার শিথিল করেনি। বছরের প্রথম তিন মাসে প্রায় ১০ হাজার ৫৭৭টি গাইডেড বোমা ব্যবহার করা হয়েছে। মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত বছর এ ধরনের মোট ৪০ হাজার বোমা ব্যবহার করেছিল রাশিয়া।
রাশিয়া ২৯ মার্চ ইউক্রেনের বিরুদ্ধে ১৭২টি ড্রোন নিক্ষেপ করে, যার মধ্যে ৯৪টি গুলি করে ভূপাতিত করা হয় এবং ৬৯টি ইলেকট্রনিক জ্যামিং ব্যবহার করে লক্ষ্যভ্রষ্ট করা হয়।

গত রোববার সকালে খারকিভ শহরের একটি সামরিক হাসপাতাল এবং বেসামরিক অবকাঠামোর উদ্দেশে রাশিয়া ১১১টি ড্রোন নিক্ষেপ করেছে। ইউক্রেন ৬৫টি ড্রোন ভূপাতিত করেছে এবং ৩৪টিকে লক্ষ্যচ্যুত করেছে। খারকিভ অঞ্চলে ছয়টি শাহেদ ড্রোন বেসামরিক স্থাপনায় আঘাত করেছে, যার ফলে বেশ কয়েকজন আহত হয়েছে।
গত বুধবার ক্রিভি রিহে একটি রুশ ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে এক শিশুসহ ১৭ জন বেসামরিক লোক আহত হয়েছে। শুধু কৃষ্ণ সাগরেই রাশিয়া যুদ্ধবিরতির জন্য কোনো বাস্তব ইচ্ছা প্রকাশ করেছে বলে মনে হয়েছে। নৌবাহিনীর মুখপাত্র দিমিত্রো প্লেটেনচুক বলেছেন, যদিও কোনো আনুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি হয়নি, তবে রাশিয়ার বাহিনী ইউক্রেনীয় বন্দরগুলোতে আক্রমণ করেনি এবং কৃষ্ণ সাগরে থাকা নৌবহর সাগরের পূর্ব অংশে রয়েছে।