ট্রাম্পের হুমকির পর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বসছে ইরান
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান নিশ্চিত করেছেন যে, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা শুরুর নির্দেশ দিয়েছেন। তবে তিনি বলেছেন, এই আলোচনা হতে হবে হুমকিমুক্ত পরিবেশে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এর আগে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, ইরান কোনো চুক্তিতে না পৌঁছালে ‘খারাপ কিছু’ ঘটতে পারে।
এই আলোচনা কোথায় অনুষ্ঠিত হবে সে বিষয়ে অবশ্য ইরানের পক্ষ থেকে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা হয়নি। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন আরব কর্মকর্তা এএফপি-কে জানিয়েছেন, আঙ্কারার পাশাপাশি মিসর, ওমান এবং কাতারের কূটনৈতিক মধ্যস্থতার ফলে আগামী শুক্রবার তুরস্কে এই বৈঠক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। খবর বার্তা সংস্থা এএফপির।
গত মাসে ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে প্রাণঘাতী পদক্ষেপ নেওয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সামরিক অভিযানের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন এবং মধ্যপ্রাচ্যে একটি বিমানবাহী রণতরী বহরও পাঠিয়েছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প অবশ্য জানিয়েছেন, তিনি তেহরানের সঙ্গে একটি ‘মীমাংসায়’ পৌঁছানোর ব্যাপারে আশাবাদী, তবে একই সঙ্গে সতর্ক করেছেন যে, চুক্তি না হলে ‘খারাপ কিছু ঘটবে’।
তেহরান বারবার কূটনীতির ওপর জোর দিলেও যেকোনো আগ্রাসনের মুখে চূড়ান্ত জবাব দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘আমি আমার পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে নির্দেশ দিয়েছি—যদি উপযুক্ত পরিবেশ বজায় থাকে, যা হবে হুমকি এবং অযৌক্তিক প্রত্যাশামুক্ত—তাহলে কেবল ন্যায়সংগত ও সামঞ্জস্যপূর্ণ আলোচনা চালিয়ে নেওয়া যায়।’
প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান আরও বলেন, ‘বন্ধুপ্রতীম সরকারগুলোর অনুরোধের প্রেক্ষিতেই আলোচনার এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।’
এদিকে, আজ মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক তৎপরতা খুবই নিবিড়ভাবে চলছে এবং তা প্রতিবেশীদের সঙ্গে সমন্বয় করে করা হচ্ছে। এর আগে সংযুক্ত আরব আমিরাতের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেছিলেন, ইরানের উচিত একটি চুক্তিতে পৌঁছানো এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক পুনর্গঠন করা।
এ প্রসঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ বলেন, ‘আমি সরাসরি ইরান-আমেরিকা আলোচনা দেখতে চাই, যা একটি সমঝোতার দিকে নিয়ে যাবে এবং আমাদের যাতে প্রতি দুই দিন অন্তর এ ধরনের সংকটের সম্মুখীন হতে না হয়।’
ইরান বারবার জোর দিয়ে বলছে, যেকোনো আলোচনা শুধুমাত্র পারমাণবিক ইস্যুতেই সীমাবদ্ধ থাকতে হবে। দেশটির কর্মকর্তারা তাদের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বা প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নিয়ে যেকোনো আলোচনার সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন।
সোমবার মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএনে প্রচারিত একটি সাক্ষাৎকারে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেন, আলোচনার অংশীদার হিসেবে তেহরান ওয়াশিংটনের ওপর আস্থা হারিয়েছে, তবে পারমাণবিক ইস্যুতে একটি চুক্তিতে পৌঁছানো এখনো সম্ভব।
আব্বাস আরাঘচি বলেন, ‘যদি মার্কিন প্রতিনিধি দল প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কথা অনুসরণ করে—অর্থাৎ পারমাণবিক অস্ত্র থাকবে না এটি নিশ্চিত করতে একটি ন্যায়সংগত ও সামঞ্জস্যপূর্ণ চুক্তিতে আসতে চায়—তবে আমি পুনরায় আলোচনার সম্ভাবনা দেখছি।’
তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে পারমাণবিক আলোচনা গত বছর ভেস্তে যায়। সে বছর জুন মাসে ইসরায়েল ইরানের ওপর নজিরবিহীন বোমা হামলা শুরু করে, যা পরবর্তীতে ১২ দিনের একটি যুদ্ধের সূত্রপাত ঘটায়।
ইসরায়েলি সেই হামলায় ইরানের পারমাণবিক ও সামরিক স্থাপনার পাশাপাশি আবাসিক এলাকাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। হামলায় ইরানের সামরিক কমান্ডার, পরমাণু বিজ্ঞানীসহ আরও কয়েকশ মানুষ নিহত হয়। যুক্তরাষ্ট্রও সংক্ষিপ্তভাবে এই যুদ্ধে যোগ দিয়ে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক কেন্দ্রগুলোতে হামলা চালায়। ইরান এর জবাবে ইসরায়েলে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা করে এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম সামরিক ঘাঁটি কাতারেও হামলা চালায়।
গত বছরের জানুয়ারিতে দ্বিতীয়বারের মতো ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে তার ‘সর্বোচ্চ চাপ’ প্রয়োগ বজায় রাখাসহ দেশটির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের নীতি প্রয়োগ করছেন। যার ফলে দেশটির ভঙ্গুর অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে গত বছরের ডিসেম্বরে তেহরানে বিক্ষোভ শুরু হয়, যা পরে দেশব্যাপী সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয় এবং কর্তৃপক্ষ সেই বিক্ষোভ দমনে কঠোর ও প্রাণঘাতী পদক্ষেপ নেয়। ইরানের সরকারি হিসাব অনুসারে সেই সময়ের সহিংস ঘটনায় তিন হাজারেরও বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটে।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক