বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে ভারতের এত আগ্রহ কেন?
এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আজ বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) জাতীয় নির্বাচনের ভোট হচ্ছে বাংলাদেশে। ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-নেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর এটিই প্রথম সাধারণ নির্বাচন। এই নির্বাচনকে ঘিরে ভারত ও পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর গভীর আগ্রহের কেন্দ্রে রয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তিত ভূ-রাজনীতি। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে প্রায় ১৩ কোটি ভোটার ৪৩ হাজার কেন্দ্রে তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করছেন।
দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে এই নির্বাচনকে ঘিরে ভারতের প্রবল আগ্রহ ও নজরদারি এখন আলোচনার তুঙ্গে। কেন ভারতের কাছে এই নির্বাচন এতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার নেপথ্যে রয়েছে নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও কৌশলগত গভীর কিছু কারণ–
১. নিরাপত্তা ও উত্তর-পূর্ব ভারতের স্থিতিশীলতা
ভারতের সাতটি রাজ্য (সেভেন সিস্টার্স) বাংলাদেশের সীমান্ত সংলগ্ন। গত দেড় দশকে শেখ হাসিনা সরকারের সঙ্গে ভারতের অত্যন্ত নিবিড় নিরাপত্তা সহযোগিতা ছিল। ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীদের দমনে বাংলাদেশ যে ভূমিকা রেখেছিল, তা নয়াদিল্লির কাছে ছিল অত্যন্ত স্বস্তিদায়ক। এখন নতুন সরকার বা রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে সেই সহযোগিতার ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে কি না, তা ভারতের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়।
২. চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ও ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা
ভারত মনে করে, বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা বা পটপরিবর্তন চীনের জন্য সুযোগ তৈরি করতে পারে। বর্তমানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সঙ্গে চীনের ঘনিষ্ঠতা এবং পাকিস্তানের সঙ্গে সরাসরি বিমান যোগাযোগ ও প্রতিরক্ষা চুক্তির সম্ভাবনা ভারতকে সতর্ক করে তুলেছে। বঙ্গোপসাগরে ভারতের একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রাখতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক মেরুকরণ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
৩. কানেক্টিভিটি ও ট্রানজিট সুবিধা
ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সংযোগের জন্য বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে ট্রানজিট ও ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহারের যে সুযোগ ভারত এখন পাচ্ছে, নতুন সরকার এলে সেই চুক্তির ভবিষ্যৎ কী হবে—সেটি ভারতের কাছে বড় একটি প্রশ্ন।
৪. সংখ্যালঘু নিরাপত্তা ও ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি
বাংলাদেশে হিন্দুসহ অন্যান্য সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতার যে কোনো খবর ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের নির্বাচনে বড় প্রভাব ফেলে। ২০২৪ সালের আগস্টের পরবর্তী অস্থিরতা এবং দুই হাজার ৪০০-এর বেশি সংখ্যালঘু-সম্পর্কিত অভিযোগের প্রেক্ষাপটে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারও চাপের মুখে রয়েছে। এ কারণে তারা চায় এমন একটি সরকার আসুক, যা সব ধর্মের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
৫. কূটনৈতিক ‘রিসেট’ ও বিএনপির সঙ্গে নতুন সম্পর্ক
বহু বছর ধরে ভারত বিএনপিকে সন্দেহের চোখে দেখলেও সাম্প্রতিক সময়ে তাদের কূটনৈতিক কৌশলে পরিবর্তন এসেছে। ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করা ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ব্যক্তিগত চিঠি পাঠানো প্রমাণ করে যে, ভারত এখন সব প্রধান রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ায় মনোযোগী। ভারত চায় না বাংলাদেশের আগামীর রাজনৈতিক পথচলায় তারা একা হয়ে পড়ুক।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক