বন্ধ হয়ে গেল সেই ‘ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি’
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি- এক সময়ের মহাপ্রতাপশালী ব্রিটিশ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, যেটি পুরো ভারতীয় উপমহাদেশের বিশাল অংশ শাসন করেছিল এবং এই অঞ্চলে ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের সূচনা করেছিল, সেটি এখন দেউলিয়া হয়ে বন্ধ হয়ে গেছে। ১৫২ বছর আগে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়া এই প্রতিষ্ঠানটি ২০১০ সালে পুনরুজ্জীবিত হয়ে বিলাসপণ্যের খুচরা বিক্রেতা হিসেবে সাম্প্রতিক সময়ে কাজ চালিয়ে এলেও এর পথচলা থেমে গেল। খবর ইন্ডিয়া টুডের।
১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের পর ভারতের শাসনভার ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছ থেকে ব্রিটিশ সরকার কেড়ে নেয়। ১৮৫৮ সালে ব্রিটিশ রাজমুকুট সরাসরি এর নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে, যা ভারতে সরাসরি ব্রিটিশ শাসনের সূচনা করে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির উত্তরাধিকার মূলত নেতিবাচক হিসেবেই দেখা হয়, কারণ ভারত ও এশিয়ার বাকি অংশে এটি ব্যাপক হারে শোষণ চালিয়েছিল। এটি বিশ্ববাণিজ্যকে বদলে দিলেও ভারতীয়দের জন্য চরম দুর্ভোগ বয়ে এনেছিল।
২০১০ সালে ভারতীয় উদ্যোক্তা সঞ্জীব মেহতা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নামের স্বত্ব কিনে নেন। যে কোম্পানি একসময় ভারতকে শাসন করেছিল, এখন তা একজন ভারতীয়র অধীনে—এই খবরটি বিশ্বের বিভিন্ন সংবাদপত্রের শিরোনামে উদযাপন করা হয়েছিল। তবে কোম্পানির আধুনিক সংস্করণটি এখন বিলুপ্তির পথে।
‘দ্য সানডে টাইমস’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি লিমিটেড ২০২৫ সালের অক্টোবরে লিকুইডেটর বা অবসায়ক নিয়োগ করেছে। ব্রিটিশ সংবাদপত্রের তথ্যমতে, ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডে নিবন্ধিত এর মূল গ্রুপের কাছে কোম্পানিটির দেনা ৬ লাখ পাউন্ডেরও বেশি। এছাড়া কর বাবদ ১ লাখ ৯৩ হাজার পাউন্ড এবং কর্মচারীদের পাওনা ১ লাখ ৬৩ হাজার পাউন্ড বকেয়া রয়েছে। মালিক সঞ্জীব মেহতার সঙ্গে যুক্ত ‘ইস্ট ইন্ডিয়া’ নামধারী আরও বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানও বিলুপ্ত করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
বর্তমানে কোম্পানির ওয়েবসাইটটি বন্ধ। লন্ডনের মেফেয়ারের ৯৭ নিউ বন্ড স্ট্রিটে অবস্থিত দোকানটি খালি পড়ে আছে এবং ভাড়ার জন্য এজেন্টদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এর সাথে যুক্ত অন্য একটি প্রতিষ্ঠান, ‘ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কালেকশনস লিমিটেড’ও সম্প্রতি পাওনাদারদের পক্ষ থেকে মামলার মুখোমুখি হয়েছে।
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে পুনরুজ্জীবিত করা উদ্যোক্তা সঞ্জীব মেহতা
সঞ্জীব মেহতা ২০০০-এর দশকের শুরুতে শেয়ারহোল্ডারদের কাছ থেকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নাম কেনার প্রক্রিয়া শুরু করেন। ২০১০ সালে তিনি মেফেয়ারে ২ হাজার বর্গফুটের একটি বিলাসবহুল দোকান খোলেন। সেখানে উচ্চমানের চা, চকলেট, মিষ্টান্ন, মসলা ও অন্যান্য সামগ্রী বিক্রি হতো, যা অনেকটা বিখ্যাত ‘ফোর্টনাম অ্যান্ড ম্যাসন’ নামক দোকানের মতো ছিল।
সঞ্জীব মেহতা একে উপনিবেশবাদের প্রতীককে ইতিবাচক কিছুতে রূপান্তর হিসেবে দেখেছিলেন। ২০১৭ সালে ‘দ্য গার্ডিয়ান’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘একজন ভারতীয় এখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মালিক, এর অর্থ হলো নেতিবাচকতা ইতিবাচকতায় রূপান্তরিত হয়েছে। ঐতিহাসিক ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আগ্রাসনের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছিল, কিন্তু আজকের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সহমর্মিতার ওপর প্রতিষ্ঠিত।’
১৮০০-এর দশকের শুরুতে যখন কোম্পানিটি শিখরে ছিল, তখন এর অধীনে প্রায় আড়াই লাখ সৈন্যের একটি ব্যক্তিগত সেনাবাহিনী ছিল, যা সেই সময়ের ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর তুলনায় দ্বিগুণ বড়। এটি মসলা, তুলা, রেশম, চা ও নীলের বিশ্ববাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করত।
মূল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সংক্ষিপ্ত ইতিহাস
১৬০০ সালের ৩১ ডিসেম্বর রানি প্রথম এলিজাবেথের রাজকীয় সনদের মাধ্যমে ইংলিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রতিষ্ঠিত হয়। ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে মসলা ও পণ্য আমদানির প্রতিযোগিতায় নামার জন্য এটি একটি যৌথ মূলধনী প্রতিষ্ঠান হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিল।
এটি ছিল বিশ্বের প্রথম যৌথ মূলধনী কোম্পানিগুলোর একটি, যেখানে বিনিয়োগকারীরা শেয়ার কিনতেন এবং লাভ-ক্ষতির অংশীদার হতেন। কোম্পানিটি ১৬১২-১৬১৩ সালে ভারতের সুরাটে তাদের প্রথম বাণিজ্যিক কেন্দ্র স্থাপন করে। সময়ের সাথে সাথে এটি উত্তমাশা অন্তরীপের পূর্বে ব্রিটিশ বাণিজ্যের একচেটিয়া অধিকার লাভ করে।
১৭০০ সালের মধ্যে এটি একটি প্রধান শক্তিতে পরিণত হয়; কেল্লা তৈরি করে, স্থানীয় শাসকদের সাথে মিত্রতা গড়ে তোলে এবং ফরাসি ও স্থানীয় রাজ্যগুলোর বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালায়। ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধের পর এটি কর আদায় শুরু করে, আদালত পরিচালনা করে এবং বাংলার মতো অঞ্চল শাসন করতে থাকে। চরম শিখরে থাকাকালীন, কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে বিশ্ববাণিজ্যের অর্ধেকই এই কোম্পানির দখলে ছিল এবং এটি ভারতে প্রায় একটি সরকারের মতোই কাজ করত।
তাদের শাসন শোষণ, অর্থকরী ফসল চাষে বাধ্য করা এবং রপ্তানি নীতির কারণে দুর্ভিক্ষকে আরও ত্বরান্বিত করেছিল। চর্বিযুক্ত কার্তুজের মতো নানা ইস্যু থেকে তৈরি হওয়া ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ তাদের শাসনের অবসান ঘটায়। ১৮৭৪ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট রাজমুকুটের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের পর কোম্পানিটিকে পুরোপুরি বিলুপ্ত ঘোষণা করে।
এর ইতিহাস দেখায় কীভাবে একটি বাণিজ্যিক কোম্পানি একটি সাম্রাজ্য নির্মাতায় পরিণত হয়েছিল, যা আধুনিক ভারত, ব্রিটেন এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিকে রূপ দিয়েছিল, কিন্তু পেছনে ফেলে গেছে গভীর অবিচারের এক উত্তরাধিকার।
তাই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এই দ্বিতীয়বার বন্ধ হওয়া একটি অদ্ভুত পুনর্জাগরণের সমাপ্তি ঘটল।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক