মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ যেন ক্ষেপণাস্ত্র ও ইন্টারসেপ্টরের দম ফুরানোর লড়াই
মধ্যপ্রাচ্যের চলতে থাকা যুদ্ধকে এখন পর্যন্ত দুটি চিত্রে সংজ্ঞায়িত হয়েছে; প্রথমটি হলো- ইরানি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের মাটিতে আছড়ে পড়ে বিস্ফোরিত হওয়া, আর দ্বিতীয়টি হলো- সেগুলোকে ঠেকাতে আকাশে ইন্টারসেপ্টর বা প্রতিরোধ ক্ষেপণাস্ত্রের তীব্র গতিতে ছুটে চলা।
ওপেন সোর্স ইন্টেলিজেন্স বিশেষজ্ঞ সংস্থা মিন্টেল ওয়ার্ল্ড জানিয়েছে, যুদ্ধের প্রথম দুই দিনে ইরান সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, বাহরাইন, কাতার এবং জর্ডানকে লক্ষ্য করে প্রায় ৪০০টি ক্ষেপণাস্ত্র এবং এক হাজারটির মতো ড্রোন নিক্ষেপ করে। এই পরিসংখ্যানে অবশ্য ইরানের প্রধান লক্ষ্যবস্তু ইসরায়েলকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। খবর বার্তা সংস্থা এএফপির।
মার্কিন ভিত্তিক মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ এবং প্রাক্তন মেরিন কর্মকর্তা স্কট বেনেডিক্ট এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘এটি আসলে কার অস্ত্রভাণ্ডার কত গভীর, তারই লড়াই। এটি অনেকটা এমন যে, দুইজন তীরন্দাজ একে অপরের দিকে তীর ছুড়ছে; কার তীর আগে ফুরিয়ে যায় সেটাই এখন দেখার বিষয়।’
ব্যয়বহুল সুরক্ষা বনাম সস্তা আক্রমণ
যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা জেনারেল ড্যান কেইন এক প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেছেন, তাদের সমন্বিত আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ‘ঠিক যেভাবে পরিকল্পনা করা হয়েছিল সেভাবেই কাজ করছে’ এবং শত শত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করছে। তবে এই ব্যবস্থা কতদিন এভাবে চলতে পারবে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে, কারণ ইন্টারসেপ্টরগুলো অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং এগুলোর সরবরাহও সীমিত।
গত জুনের ১২ দিনের যুদ্ধের শেষে বিশেষজ্ঞরা অনুমান করেছিলেন যে, ইরানের কাছে ইসরায়েলে আঘাত হানতে সক্ষম কয়েকশ থেকে প্রায় দুই হাজারটি ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। এটি তাদের স্বল্পপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত থেকে আলাদা। এছাড়া ইরান ড্রোন ব্যবহার করছে, যা কার্যকারিতায় কিছুটা কম হলেও তৈরি করা অনেক সস্তা।
তীর নয়, তীরন্দাজকে লক্ষ্য করা
ইসরায়েলি একটি নিরাপত্তা সূত্র জানিয়েছে, ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ছুড়তে ইরানকে যে লঞ্চ ভেহিকেল বা উৎক্ষেপণ যান ব্যবহার করতে হয়, তার বেশিরভাগই জুনে ধ্বংস হয়েছে। বাকি থাকা যানগুলোকে এখন লক্ষ্যবস্তু করছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ এই যুদ্ধকে ‘তীরের বদলে তীরন্দাজকে গুলি করার’ সাথে তুলনা করেছেন।
ফ্রান্স ভিত্তিক ফাউন্ডেশন ফর স্ট্র্যাটেজিক রিসার্চ-এর গবেষক এতিয়েন মার্কুয়েজ বলেন, ‘ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের সাম্প্রতিক আক্রমণের মাত্রা আগের তুলনায় কিছুটা কমেছে। এটি প্রশ্ন জাগায় যে—তারা কি দীর্ঘ যুদ্ধের জন্য মজুত বাঁচিয়ে রাখছে, নাকি তাদের সমন্বিত বড় হামলার ক্ষমতা ফুরিয়ে আসছে?’ তবে তিনি সতর্ক করেন যে, কিছু ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করে লক্ষ্যে আঘাত হানছে, যার অর্থ হলো ইন্টারসেপ্টর বাঁচিয়ে চলতে গিয়ে ইসরায়েলিদের সুরক্ষা ব্যবস্থা আর আগের মতো নিশ্ছিদ্র নেই।
ইন্টারসেপ্টরের সংকট
মার্কুয়েজ বলেন, প্রতিটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে অন্তত দুটি ইন্টারসেপ্টর ছুড়তে হয়। ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রগুলো অত্যন্ত দামি এবং এগুলো খুব অল্প সংখ্যায় উৎপাদিত হয়। যেমন : থাড ক্ষেপণাস্ত্র : বছরে মাত্র ৯৬টি উৎপাদিত হয়। (জুনের ১২ দিনের যুদ্ধে প্রায় ১৫০টি থাড ছুড়তে হয়েছিল) এবং প্যাট্রিয়ট সিস্টেম : বছরে মাত্র ৬০০টি উৎপাদিত হয়।
মার্কুয়েজের মতে, ‘এই মজুত খুব বেশিদিন টিকবে না।’ তাই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জন্য দ্রুততম সময়ে ইরানের লঞ্চারগুলো ধ্বংস করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে তেহরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকি পুরোপুরি নির্মূল করা অবাস্তব। রাজনৈতিক সমাধান না হলে ইয়েমেনের হুথিদের মতো ইরানও একটি ‘অবশিষ্ট সক্ষমতা’ ধরে রাখবে, যা বছরের পর বছর ধরে অল্প কিন্তু নিরবচ্ছিন্ন চাপ বজায় রাখবে।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক