নিজের শুরু করা যুদ্ধের নিয়ন্ত্রণ কি ট্রাম্পের হাতে?
একজন দক্ষ রিয়েলিটি টেলিভিশন হোস্টের মতো ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর দর্শকদের ধাঁধায় রাখছেন এভাবে যে, ঠিক কখন তিনি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সমাপ্তি টানবেন। গত সোমবার (৯ মার্চ) রুশ নেতা ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে এক ঘণ্টা ফোনালাপের পর তিনি ঘোষণা করেন, ‘এই সংঘাত মোটামুটি শেষ’। তবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কেবল তাঁর একার—এমন ধারণা এখন নিছক বিভ্রমে পরিণত হয়েছে।
তবে কেন ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’-কে একটি ‘মহাকাব্যিক ব্যর্থতা’ হিসেবে মনে রাখা উচিত, তার অন্যতম কারণ হলো মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সেই ক্ষমতা নেই যা দিয়ে তিনি নিজের শুরু করা এই উন্মাদনাকে থামাতে পারেন।
ট্রাম্প যদি যুক্তরাষ্ট্রের লড়াই বন্ধ করার নির্দেশও দেন, ইরান কেন তা মেনে নেবে? কেন তারা সেই ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন হামলা বন্ধ করবে যা ইতোমধ্যে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বিপর্যয় নামিয়েছে এবং তেলের দামকে ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলারের ওপরে পৌঁছে দিয়েছে?
ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) ট্রাম্পের যুদ্ধ শেষের সেই ঘোষণার জবাবে বলেছে: ‘যুদ্ধ কবে শেষ হবে তা আমরাই নির্ধারণ করব।’ তারা আরও বলেছে: ‘আঞ্চলিক সমীকরণ এবং ভবিষ্যতের নির্দেশনা এখন ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর হাতে।
ইরানের কট্টরপন্থি শাসকরা বিষয়টিকে এভাবে দেখছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট জনসমক্ষে হামলা বন্ধের কথা ভাবছেন অথচ ইসলামি প্রজাতন্ত্রের নেতৃত্ব এখনো অটুট এবং প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির হাত থেকে ক্ষমতা তাঁর ছেলে মোজতবা খামেনির কাছে সফলভাবে হস্তান্তরিত হয়েছে—এটিই প্রমাণ করে যে ইরান এখন সুবিধাজনক অবস্থানে আছে।
বিপ্লবী গার্ডের কাছে তেলের দাম বাড়িয়ে দেওয়াটাই একটি সাফল্য। প্রতিটি উপসাগরীয় রাষ্ট্রে ক্ষেপণাস্ত্র এবং কামিকাজে ড্রোন হামলা চালিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের শক্তি প্রদর্শন করাও তাদের জন্য বড় বিজয়। আর এই শাসনব্যবস্থার টিকে থাকাটাই তাদের কাছে জয়। আইআরজিসি কমান্ডাররা যদি মনে করেন তারা এগিয়ে আছেন, তবে তারা কেন থামবেন? যখন শত্রুপক্ষ প্রকাশ্যে দ্বিধাগ্রস্ত থাকে, সেটিই তো আরও আঘাত করার মোক্ষম সময়। সর্বোপরি, আইআরজিসি-র লক্ষ্য হবে যুদ্ধের ‘শেষ গুলিটি’ তারাই ছুড়বে।
অবশ্য ইরানের প্রশাসনে এখনো কিছু বাস্তববাদী মানুষ আছেন যারা ভয় পাচ্ছেন যে, সব উপসাগরীয় দেশে হামলা চালিয়ে তারা হয়তো বড় ধরনের ভুল হিসাব করেছেন। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এমনকি এই হামলার জন্য প্রকাশ্যে ক্ষমাও চেয়েছেন। তিনি হয়তো বিশ্বাস করেন যে, ইরানের চরম প্রতিশোধ তাদের প্রতিবেশীদের বিমুখ করবে এবং ট্রাম্পের সেই যুক্তিকেই সত্য প্রমাণ করবে যে—ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নির্মূল করতে এই যুদ্ধ প্রয়োজন ছিল।
কিন্তু আইআরজিসি-র কট্টরপন্থিরা এবং খামেনি—যিনি নিজে বিপ্লবী গার্ডের একজন প্রবীণ সদস্য—তারাই এখন সব সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। আইআরজিসি-র সাবেক প্রধান মোহসেন রেজায়ি তেহরানের মনোভাব স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘ট্রাম্প এবং নেতানিয়াহু পারস্য উপসাগরের কসাইখানায় আটকা পড়েছেন। তারা স্বল্পমেয়াদী যুদ্ধের পরিকল্পনা করে বড় ভুল করেছেন, তারা বোঝেননি যে এটি দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।’
শত্রু যা চায় কখনোই তা হতে না দেওয়ার নীতি অনুযায়ী, আইআরজিসি হয়তো ট্রাম্পকে এমন এক দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ উপহার দিতে বদ্ধপরিকর যা তিনি কল্পনাও করেননি।
তবে মোহসেন রেজায়ি হয়তো যুদ্ধের অন্য পক্ষটিকে চিনতে ভুল করেছেন। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও নির্ধারণ করবেন লড়াই কখন থামবে এবং তাঁর অগ্রাধিকার হবে ইরানকে সব দিক থেকে দুর্বল করা। এ প্রসঙ্গে তেল আবিবের ‘ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজ’-এর রাজ জিমত বলেন, ইসরায়েলের লক্ষ্য হলো ইরানের কৌশলগত সক্ষমতা, বিশেষ করে তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র যতটা সম্ভব ধ্বংস করা।
ইরানের মাটির নিচে থাকা অস্ত্রাগার এবং মোবাইল লঞ্চারগুলো ধ্বংস করতে এই ১১ দিনের চেয়ে অনেক বেশি সময় লাগবে। ট্রাম্প যখন প্রকাশ্যে অভিযান বন্ধের গুঞ্জন তুলছেন, নেতানিয়াহু তখন স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছেন, ‘আমরা এখনো যুদ্ধ শেষ করিনি।’
যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও ইসরায়েলের একাকী বোমাবর্ষণ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা রয়েছে। নেতানিয়াহু চান খামেনি প্রশাসন যাতে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার এবং পারমাণবিক কর্মসূচি পুনর্গঠন করতে যেন দীর্ঘ সময় নেয়। মনে রাখতে হবে, গত জুনে নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রের অপেক্ষা না করেই ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা শুরু করেছিলেন। সেই ১২ দিনের যুদ্ধের ১১ দিনই ইসরায়েল একাকী লড়েছিল।
অন্যদিকে, লেবানন-ভিত্তিক হিজবুল্লাহ ইরানের সাহায্যে এগিয়ে এসে নতুন ফ্রন্ট খুলে দিয়েছে। নেতানিয়াহু দক্ষিণ লেবাননে স্থলবাহিনী পাঠিয়ে এবং বৈরুতসহ পুরো দেশে বিমান হামলা চালিয়ে এর জবাব দিচ্ছেন। লেবাননের এই নতুন আগুনে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি কোনো ভূমিকা নেই। ট্রাম্প ইরানে যা-ই করুন না কেন, হিজবুল্লাহ এবং ইসরায়েলের সংঘাত থামানোর ক্ষমতা তাঁর নেই। ইরানে আক্রমণ করে তিনি লেবাননে যে রক্তক্ষয় শুরু করেছেন, অনিচ্ছাকৃতভাবে শুরু করা সেই আগুন তিনি নেভাতে পারবেন না।
ট্রাম্প নিজেকে সব অনুষ্ঠানের প্রধান আয়োজক বা 'মাস্টার অফ সেরেমনি' হিসেবে দেখতে পছন্দ করেন। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে তিনি যে যুদ্ধ শুরু করেছেন, তা এখন নিজেই এক দানবীয় শক্তিতে রূপ নিয়েছে। যুদ্ধের শেষ গুলিটি ছুড়ে বিজয়ের হাসি হাসার সুযোগ তাঁর হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক