সংবাদমাধ্যম জগতের পথিকৃৎ টেড টার্নার আর নেই
সংবাদমাধ্যম জগতের পথিকৃৎ টেড টার্নার মারা গেছেন। তিনি প্রখ্যাত মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যা বিশ্বের প্রথম ২৪ ঘণ্টার সংবাদ নেটওয়ার্ক হিসেবে টেলিভিশন সাংবাদিকতায় বিপ্লব ঘটিয়েছিল। টার্নার এন্টারপ্রাইজের একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, আজ বুধবার (৬ মে) ৮৭ বছর বয়সে তিনি তাঁর পরিবারের সান্নিধ্যে শান্তিতে মৃত্যুবরণ করেছেন। খবর সিএনএনের।
ওহাইওতে জন্ম নেওয়া আটলান্টার এই ব্যবসায়ী তাঁর স্পষ্টভাষী স্বভাবের জন্য ‘দ্য মাউথ অফ দ্য সাউথ’ ডাকনামে পরিচিত ছিলেন। তিনি এমন এক বিশাল মিডিয়া সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন যার মধ্যে ছিল ক্যাবল টিভির প্রথম সুপারস্টেশন এবং চলচ্চিত্র ও কার্টুনের জন্য জনপ্রিয় সব চ্যানেল। এর পাশাপাশি আটলান্টা ব্রেভস-এর মতো পেশাদার স্পোর্টস টিমও তাঁর সাম্রাজ্যের অংশ ছিল।
টার্নার একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন নাবিকও ছিলেন। তিনি ছিলেন একজন লোকহিতৈষী যিনি জাতিসংঘ ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন; একজন সক্রিয় কর্মী যিনি বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক অস্ত্র নির্মূলের চেষ্টা করেছিলেন এবং একজন সংরক্ষণবাদী হিসেবে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান ভূস্বামী হয়ে উঠেছিলেন। আমেরিকার পশ্চিমাঞ্চলে বাইসন বা বন্য মহিষদের পুনরায় ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এমনকি শিশুদের পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন করতে তিনি 'ক্যাপ্টেন প্ল্যানেট' কার্টুনটি তৈরি করেছিলেন।
তবে বিশ্বজুড়ে রিয়েল-টাইমে ২৪ ঘণ্টা খবর পৌঁছে দেওয়ার যে সাহসী দৃষ্টিভঙ্গি তিনি দেখিয়েছিলেন, সেটিই মূলত তাঁকে বিখ্যাত করে তোলে। ১৯৯১ সালে টাইম ম্যাগাজিন টার্নারকে 'ম্যান অফ দ্য ইয়ার' হিসেবে মনোনীত করে কারণ তিনি ঘটনার গতিধারাকে প্রভাবিত করেছিলেন এবং ১৫০টি দেশের দর্শকদের ইতিহাসের তাৎক্ষণিক সাক্ষীতে পরিণত করেছিলেন। টার্নার শেষ পর্যন্ত তাঁর নেটওয়ার্কগুলো টাইম ওয়ার্নারের কাছে বিক্রি করে ব্যবসা থেকে সরে দাঁড়ান, কিন্তু সিএনএন-এর জন্য সবসময় গর্ব প্রকাশ করতেন এবং একে তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জন বলে অভিহিত করতেন।
সিএনএন ওয়ার্ল্ডওয়াইড-এর চেয়ারম্যান ও সিইও মার্ক থম্পসন এক বিবৃতিতে বলেন, ‘টেড ছিলেন একজন নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত এবং প্রতিশ্রুতিবদ্ধ নেতা; সাহসী, নির্ভীক এবং সর্বদা নিজের বিচারবুদ্ধির ওপর আস্থা রাখতে ইচ্ছুক। তিনি সিএনএন-এর চালিকাশক্তি ছিলেন এবং চিরকাল থাকবেন। টেড হলেন সেই মহীরুহ যাঁর কাঁধে আমরা দাঁড়িয়ে আছি। আজ আমরা সবাই তাঁর প্রতি এবং আমাদের জীবন ও বিশ্বের ওপর তাঁর প্রভাবের প্রতি শ্রদ্ধা জানাব।’
উলফ ব্লিৎজার যুক্তরাষ্ট্রর স্থানীয় সময় বুধবার সকালে সম্প্রচারের সময় টার্নারের মৃত্যুর খবর ঘোষণা করতে গিয়ে বলেন, ‘তিনি ছিলেন এক কিংবদন্তি; সিএনএন-এর মাধ্যমে প্রথম ২৪ ঘণ্টার সংবাদ চ্যানেল তৈরি করে তিনি টেলিভিশন ব্যবসাকে বদলে দিয়েছিলেন।’ ব্লিৎজারের সহ-উপস্থাপক পামেলা ব্রাউন বলেন, ‘টেড ছিলেন বলেই আজ আমরা সবাই এখানে কাজ করতে পারছি।’ ক্রিশ্চিয়ান আমানপুর বলেন, ‘তিনি ছিলেন অনন্য। তিনি আমাদের গর্বিত করেছিলেন, আশাবাদী করেছিলেন এবং একটি সুন্দর বিশ্বের জন্য তাঁর লক্ষ্য পূরণে আমাদের উদ্বুদ্ধ করেছিলেন।’
২০১৮ সালে তাঁর ৮০তম জন্মদিনের ঠিক এক মাস আগে টার্নার প্রকাশ করেছিলেন যে তিনি লুই বডি ডিমেনশিয়ায় (মস্তিষ্কের একটি ব্যাধি) আক্রান্ত। ২০২৫ সালের শুরুর দিকে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে তিনি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন এবং পরে একটি পুনর্বাসন কেন্দ্রে সুস্থ হয়ে ওঠেন। মৃত্যুকালে টার্নার তাঁর পাঁচ সন্তান, ১৪ জন নাতি-নাতনি এবং দুই জন পুতি রেখে গেছেন।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক