ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের ‘অবিশ্বাস্য’ নির্ভুলতা, নেপথ্যে চীনের প্রযুক্তি?
চলমান মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে ইরান ও হিজবুল্লাহর ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোনের অভাবনীয় নির্ভুলতা দেখে বিশ্বজুড়ে সামরিক বিশ্লেষকদের মধ্যে একটি প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে—ইরান কি তবে মার্কিন জিপিএস বর্জন করে চীনের অত্যন্ত শক্তিশালী প্রযুক্তি ‘বেইডু’ নেভিগেশন সিস্টেম ব্যবহার করছে? গোয়েন্দা বিশেষজ্ঞ ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক হামলায় ইসরায়েল ও মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোতে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের নিখুঁত নিশানার পেছনে বেইডু সিস্টেমের বড় ভূমিকা থাকার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।
ফ্রান্সের বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থার (ডিজিএসই) প্রাক্তন পরিচালক আলাইন জুইলেট এই সপ্তাহে এক পডকাস্টে জানান, গত বছরের ১২ দিনের যুদ্ধের তুলনায় বর্তমান সংঘাতে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের লক্ষ্যভেদ অনেক বেশি নিখুঁত। তিনি বলেন, ‘আট মাস আগের তুলনায় ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের এই উন্নতি নির্দেশিকা ব্যবস্থা নিয়ে অনেক প্রশ্ন তোলে। সম্ভবত ইরানকে চীনের বেইডু সিস্টেমে প্রবেশাধিকার দেওয়া হয়েছে।’
২০২০ সালে চীন তাদের নিজস্ব স্যাটেলাইট নেভিগেশন সিস্টেম ‘বিডিএস’ (বিডিএস) পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করে। যেখানে মার্কিন জিপিএস-এ ২৪টি স্যাটেলাইট রয়েছে, সেখানে চীনা সিস্টেমে স্যাটেলাইটের সংখ্যা ৪৫টি। এটি কেবল অবস্থানই জানায় না, বরং সামরিক ব্যবহারের জন্য এনক্রিপ্ট করা সংকেত প্রদান করে যা জ্যাম করা প্রায় অসম্ভব।
কেন বেইডু সিস্টেম ইরানের জন্য গেম-চেঞ্জার?
বিশ্লেষক এলিজা ম্যাগনিয়ার ও থিও নেনসিনির মতে, ইরান আগে মূলত ‘জড়ীয় নেভিগেশন’ ব্যবহার করত, যাতে দীর্ঘ দূরত্বে সামান্য ত্রুটি জমা হয়ে লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকত। বেইডু সিস্টেম ব্যবহারের ফলে এখন যা ঘটছে-
অজেয় সংকেত : মার্কিন জিপিএস সিভিলিয়ান সিগন্যালগুলো যুক্তরাষ্ট্র যেকোনো সময় বন্ধ বা জ্যাম করতে পারে। কিন্তু বেইডু-৩ এর সামরিক স্তরের বি৩এ সিগন্যাল মূলত জ্যামিং বা ‘স্পুফিং’ (ভুল স্থানাঙ্ক দিয়ে বিভ্রান্ত করা) প্রতিরোধী।
উচ্চ নির্ভুলতা : বেইডু ব্যবহারের ফলে লক্ষ্যবস্তুর ত্রুটির মাত্রা ১ মিটারেরও (৩.৩ ফুট) নিচে নেমে এসেছে।
দ্বিমুখী যোগাযোগ : বেইডুর মাধ্যমে উড্ডয়নরত অবস্থায় দুই হাজার কিলোমিটার দূর থেকেও ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্রকে নতুন নির্দেশনা পাঠানো বা লক্ষ্য পরিবর্তন করা সম্ভব।
দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদারিত্ব
প্রতিবেদন অনুসারে, ইরান ২০১৫ সাল থেকেই বেইডু ব্যবহারের সমঝোতা স্মারক সই করে রেখেছিল। ২০২১ সালে চীনের সাথে ২৫ বছরের কৌশলগত অংশীদারিত্বের পর এই প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়। ধারণা করা হচ্ছে, ২০২৫ সালের জুনের মধ্যে ইরান তার সামরিক ও বেসামরিক (বিমান ও জাহাজ চলাচল) উভয় ক্ষেত্রেই জিপিএস নির্ভরতা পুরোপুরি কমিয়ে বেইডুতে স্থানান্তরিত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের একচেটিয়া আধিপত্যের অবসান?
যদি ইরান বেইডু ব্যবহার করে থাকে, তবে তা যুদ্ধক্ষেত্রে রিয়েল-টাইম স্যাটেলাইট গোয়েন্দা তথ্যের ওপর মার্কিন একচেটিয়া আধিপত্যের অবসান ঘটাবে। এটি কেবল ইরানের জন্যই নয়, বরং অঞ্চলের অন্যান্য দেশকেও জিপিএস-এর বিকল্প খুঁজতে প্ররোচিত করতে পারে।
বর্তমানে ইরানের হাতে মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তম ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার রয়েছে। আলাইন জুইলেটের মতে, ‘ইরান ফ্রান্সের চেয়ে তিনগুণ বড় ও তাদের ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ভ্রাম্যমাণ ট্রাকে মোতায়েন করা। এই বিশাল এলাকায় তাদের ট্র্যাক করা প্রায় অসম্ভব।’
অন্যদিকে, ট্রাম্প প্রশাসন উদ্বিগ্ন যে ইরানের সস্তা ‘শাহেদ’ ড্রোন ধ্বংস করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অত্যন্ত ব্যয়বহুল ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের ভাণ্ডার দ্রুত ফুরিয়ে আসতে পারে।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক