ইরান কি সত্যিই মার্কিন এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে?
গত সপ্তাহে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের উত্তেজনা বৃদ্ধির মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের একটি বিমানঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্রের একটি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান জরুরি অবতরণ করেছে। এই ঘটনার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দুটি সূত্র মার্কিন গণমাধ্যমকে জানিয়েছে যে, যুদ্ধাভিযান থেকে ফেরার পথে বিমানটি ইরানি হামলার শিকার হয়েছিল—যা ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমও দাবি করেছে।
যদি এটি সত্য হয়, তবে যুক্তরাষ্ট্রের আকাশপথের প্রধান শক্তি হিসেবে পরিচিত এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান প্রথমবারের মতো ইরানের হাতে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা হবে এটি। খবর আলজাজিরার।
ঘটনাটি সম্পর্কে কতটা জানা গেল?
গত বৃহস্পতিবার এফ-৩৫ স্টিলথ ফাইটারটি জরুরি অবতরণ করার পর মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) মুখপাত্র ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স জানান, বিমানটি নিরাপদে অবতরণ করেছে এবং পাইলটের অবস্থা স্থিতিশীল। তিনি বলেন, এই ঘটনাটির তদন্ত চলছে। তবে যুদ্ধবিমানটি কেন এবং কোথায় অবতরণ করেছে, তা তিনি স্পষ্ট করেননি।
একই দিন ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) এক বিবৃতিতে জানায়, তারা একটি মার্কিন বিমানকে হামলার লক্ষ্যবস্তু করেছে।
রোববার ‘এয়ার অ্যান্ড স্পেস ফোর্সেস ম্যাগাজিন’-এর এক প্রতিবেদনে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, পাইলট শার্পনেলের আঘাতে আহত হয়েছেন এবং বিমানটি মাটি থেকে ছোড়া গোলার আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এদিকে, ইরানের তাসনিম নিউজ এজেন্সি একটি ভিডিও প্রকাশ করে দাবি করেছে, তেহরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মার্কিন এফ-৩৫ বিমানে আঘাত হানছে।
এফ-৩৫ আসলে কী এবং কেন এটি স্পেশাল?
এফ-৩৫ হলো মার্কিন কোম্পানি লকহিড মার্টিনের তৈরি একটি 'স্টিলথ' (রাডার ফাঁকি দিতে সক্ষম) যুদ্ধবিমান। একে বিশ্বের ‘সবচেয়ে উন্নত যুদ্ধবিমান’ বলা হয়। এর বিশেষত্বগুলো হলো-
স্টিলথ প্রযুক্তি: এটি রাডারে ধরা না দেওয়ার মতো করে তৈরি।
অ্যাডভান্সড সেন্সর: এর ৩৬০-ডিগ্রি ক্যামেরা এবং রাডার স্যুট পাইলটকে চারপাশের পরিস্থিতি সম্পর্কে নিখুঁত তথ্য দেয়।
এফ-৩৫-এর তিনটি ধরন:
এফ-৩৫-এ: সাধারণ রানওয়েতে চলাচলের জন্য (সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত)।
এফ-৩৫-বি: হেলিকপ্টারের মতো খাড়াভাবে নামতে পারে (পাহাড়ি এলাকা বা ছোট দ্বীপের জন্য উপযোগী)।
এফ-৩৫-সি: শব্দের চেয়ে দ্রুত গতিসম্পন্ন এবং দূরপাল্লার অভিযানের জন্য তৈরি (মূলত মার্কিন নৌবাহিনী ব্যবহার করে)।
ইরান এফ-৩৫ ভূপাতিত করলে কেন তা গুরুত্বপূর্ণ হবে?
মার্কিন কর্মকর্তারা এখনও নিশ্চিত করেননি এফ-৩৫ ইরানি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘আমরা যেখানে খুশি উড়ছি। কেউ আমাদের ওপর গুলিও চালাচ্ছে না।’
প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি ইরানের দাবি সত্য হয়, তবে তা প্রমাণ করবে যে, এফ-৩৫ অপরাজেয় নয়। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রকল্পের পরিচালক আলী ভায়েজ এ প্রসঙ্গে আল জাজিরাকে বলেন, ‘এটি গুরুত্বপূর্ণ এই কারণে যে, শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মধ্যেও এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান সুরক্ষিত নয়।’
এই যুদ্ধে এ পর্যন্ত কতগুলো মার্কিন বিমান ধ্বংস হয়েছে?
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষয়ক্ষতির খতিয়ান-
১২টি এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন: এগুলো মূলত গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও হামলার জন্য ব্যবহৃত হয়।
৫টি কেসি-১৩৫ রিফুয়েলিং এয়ারক্রাফট: ১৪ মার্চ সৌদি আরবের একটি ঘাঁটিতে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় এগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
৩টি এফ-১৫-ই স্ট্রাইক ঈগল: ১ মার্চ কুয়েতি একটি বিমানের সঙ্গে ‘ফ্রেন্ডলি ফায়ারে’ এগুলো ধ্বংস হয়, তবে ক্রুরা সবাই নিরাপদে আছে।
কী বলছে সেন্টকম?
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) অবশ্য ইরানের এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার দাবিকে ‘মিথ্যা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে। তারা জানিয়েছে, চলতে থাকা ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’-তে এ পর্যন্ত আট হাজারের বেশি যুদ্ধাভিযান চালানো হলেও ইরানের হাতে কোনো মার্কিন যুদ্ধবিমান ধ্বংস হয়নি।
এখন পর্যন্ত ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধাভিযানে অন্তত ১৩ জন মার্কিন সেনা নিহত এবং প্রায় ২০০ জন আহত হয়েছে। অন্যদিকে, স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের মতে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরানে অন্তত ১ হাজার ৪৪৪ জন নিহত এবং ১৮ হাজার ৫৫১ জন আহত হয়েছে।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক