ট্রাম্পের আলোচনার বার্তার মধ্যেও ইরান-ইসরায়েল পাল্টাপাল্টি হামলা
তিন সপ্তাহ ধরে চলা মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত অবসানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘অত্যন্ত ভালো আলোচনার’ ইঙ্গিত দিলেও, উত্তেজনা থামার কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি। আজ মঙ্গলবারও (২৪ মার্চ) ইরান ও ইসরায়েল একে অপরের ওপর হামলা চালিয়েছে। খবর বার্তা সংস্থা এএফপির।
মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নিহত হওয়ার পর শুরু হওয়া এই যুদ্ধ বিশ্ব জ্বালানি বাজারকে ওলটপালট করে দিয়েছে, বিশ্ব অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করেছে। এই সংঘাত পুরো মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলকে যুদ্ধক্ষেত্র বানিয়ে পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোকেও এর ভেতরে টেনে এনেছে।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তারা ইরানের বেশ কয়েকটি এলাকায় ব্যাপক আকারের বিমান হামলা চালিয়েছে। এর আগে ইরান তেল আবিবের একটি অভিজাত এলাকার একটি ভবনে আঘাত হেনেছিল। এএফপির ছবিতে দেখা গেছে, ইসরায়েলের বাণিজ্যিক কেন্দ্রের রাস্তাগুলো ধ্বংসস্তূপে ভরে গেছে এবং একটি তিন তলা ভবন ধ্বংস হয়ে গেছে।
এর আগে, ইরানি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছিল, মার্কিন-ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান ইরানের দুটি গ্যাস স্থাপনা এবং একটি পাইপলাইনে আঘাত হেনেছে। যুদ্ধ শেষ করার আলোচনার কথা উল্লেখ করে ট্রাম্প জ্বালানি স্থাপনায় হামলার হুমকি থেকে সরে আসার মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরই এই হামলাগুলো ঘটে।
সোমবার ট্রাম্প বলেছিলেন, তার প্রশাসন ইরানের একজন অজ্ঞাতনামা শীর্ষ ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলছে। একই সাথে তিনি ইরানের বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে হামলার সময়সীমা আরও পাঁচ দিন বাড়িয়ে দেন। তবে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, কোনো আলোচনা চলছে না। তিনি ট্রাম্পের বিরুদ্ধে আর্থিক ও তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টার অভিযোগ তোলেন।
যুদ্ধ শেষ করার কূটনৈতিক প্রচেষ্টা নিয়ে যখন অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে, তখন উপসাগরীয় দেশ বাহরাইন, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সৌদি আরব জানিয়েছে, তারা আজ মঙ্গলবারও ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা প্রতিহত করেছে।
বন্ধুত্বপূর্ণ দেশের উদ্যোগ
ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই এবং আলোচনায় অগ্রগতির বিষয়ে ট্রাম্পের দাবি ইরান দ্রুতই প্রত্যাখ্যান করেছে। তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্বীকার করেছে যে, কিছু বন্ধুত্বপূর্ণ দেশের মাধ্যমে বার্তা পাঠানো হয়েছে যাকে ‘যুদ্ধ শেষ করার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনার অনুরোধ’ হিসেবে ইঙ্গিত দেয়।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ সোমবার জানান, তিনি ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সাথে কথা বলেছেন এবং মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফিরিয়ে আনতে ইসলামাবাদের সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এছাড়া মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আবদেলাতি গত রোববার ও সোমবার ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দূত স্টিভ উইটকফের সঙ্গে কথা বলেছেন।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, মার্কিন আলোচক উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনার চলতি সপ্তাহেই পাকিস্তানে একটি ইরানি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠকে বসতে পারেন এবং এতে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও যোগ দিতে পারেন। প্রথাগত মধ্যস্থতাকারী দেশ কাতার আজ মঙ্গলবার জানিয়েছে, তারা যুদ্ধ শেষ করার সব ধরনের কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে সমর্থন করে।
মার্কিন পররাষ্ট্র বিভাগ ঘোষণা করেছে যে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও শুক্রবার ফ্রান্সে জি-৭ ভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে ইরান প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা করবেন। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এটিই হবে রুবিওর প্রথম বিদেশ সফর।
‘আর কিছুই অবশিষ্ট নেই’
এদিকে ইসরায়েল লেবাননে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করেছে। তারা জানিয়েছে, তাদের সেনাবাহিনী দক্ষিণ লেবাননের লিতানি নদী পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ নেবে, যা সীমান্ত থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার ভেতরে।
ইসরায়েল সারারাত বৈরুতের দক্ষিণ শহরতলীতে বোমাবর্ষণ করেছে। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মতে, রাজধানীর দক্ষিণে বশামুনে আজ মঙ্গলবার এক হামলায় দুজন নিহত হয়েছে। ৫৫ বছর বয়সী আব্বাস কাসেম তার ক্ষতিগ্রস্ত ফ্ল্যাট দেখে কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘কিছুই অবশিষ্ট নেই। সব পুড়ে গেছে, ধ্বংস হয়ে গেছে... কোনো দেওয়াল নেই, জানালা নেই, সামনের অংশ উধাও, আমার সব পরিশ্রম শেষ হয়ে গেছে।’
২ মার্চ ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেই হত্যার প্রতিশোধ নিতে হিজবুল্লাহ ইসরায়েলে রকেট নিক্ষেপ শুরু করলে লেবাননও মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় এক হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে এবং ১০ লাখেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বাহরাইনে ইরানি হামলায় আমিরাতি সামরিক বাহিনীর একজন মরোক্কান ঠিকাদার নিহত হয়েছে, যা এই যুদ্ধের ব্যাপক প্রভাবকে ফুটিয়ে তোলে। মার্কিন ভিত্তিক হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্ট নিউজ এজেন্সির মতে, এই যুদ্ধে কমপক্ষে ৩ হাজার ২৩০ জন ইরানি নিহত হয়েছে, যার মধ্যে ১ হাজার ৪০৬ জন বেসামরিক নাগরিক।
বিশ্বাস ধ্বংস হয়ে গেছে
তেহরান যদি কৌশলগত হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে না দেয় তবে তাদের বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো ‘নির্মূল’ করার হুমকি থেকে ট্রাম্প পিছিয়ে আসায় ইরানের প্রতিবেশীরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিল। কিন্তু মঙ্গলবার তারা আবারও হামলার শিকার হলো।
তেহরান প্রতিশোধ হিসেবে পুরো অঞ্চলে মাইন স্থাপন এবং বিদ্যুৎ ও পানি অবকাঠামোতে হামলার শপথ নিয়েছিল, যা এক ঐতিহাসিক জ্বালানি সংকট তৈরির হুমকি দেয়। মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা শুরু হওয়ার পর থেকে তেহরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল সীমিত করে প্রতিশোধ নিচ্ছে, যার ফলে তেল ও গ্যাসের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে এবং বিশ্বব্যাপী উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি ও প্রবৃদ্ধির গতি কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ট্রাম্পের মন্তব্যের পর তেলের দাম কমলেও মঙ্গলবার লেনদেনে তা আবার কিছুটা বেড়েছে এবং ব্রেন্ট ক্রুড প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলারের উপরে ফিরে এসেছে। যদিও হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ তাদের সম্ভাব্য আলোচনায় বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে, তবে বিশ্লেষকরা এখনো সতর্ক।
প্যারিস ভিত্তিক থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক জঁ-জোরেস ফাউন্ডেশনের মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ ডেভিড খালফা বলেন, ‘আমি (আলোচনা নিয়ে) খুবই সন্দিহান, কারণ বিশ্বাস পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে এবং যুদ্ধরত পক্ষগুলোর অবস্থান আগের চেয়ে অনেক বেশি দূরত্বে চলে গেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘উভয় পক্ষের জন্যই কৌশল পরিবর্তনের সুযোগ খুব সীমিত।’

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক