যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের মাথায় ‘বাজ পড়ার মতো’ ইরানের নতুন প্রস্তাব
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যখন ওয়াশিংটন ও তেল আবিব যৌথভাবে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ও সামরিক ঘাঁটিতে বিমান হামলা শুরু করে, তখন থেকেই মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ বারুদের গন্ধে ভারী হয়ে ওঠে। মূলত, ইরানের ক্রমবর্ধমান পারমাণবিক সক্ষমতা ও আঞ্চলিক প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা বন্ধের অজুহাতে শুরু হওয়া এই সংঘাত এক ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।
দীর্ঘ এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যকার বিধ্বংসী যুদ্ধ যখন বিশ্ব অর্থনীতিকে খাদের কিনারে নিয়ে ঠেকিয়েছে, ঠিক তখনই তেহরানের পক্ষ থেকে এল এক অভাবনীয় এবং বিস্ময়কর প্রস্তাব। ২৮ ফেব্রুয়ারি অপারেশন ‘এপিক ফিউরি’র মাধ্যমে শুরু হওয়া এই সংঘাত এখন এমন এক মোড়ে দাঁড়িয়ে, যেখানে কূটনীতি আর রণকৌশল একে অপরকে টেক্কা দিচ্ছে। খবর সিএনএনের।
একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বিমান হামলায় ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব ও সামরিক অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, অন্যদিকে ইরান তার তুরুপের তাস ‘হরমুজ প্রণালি’র পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকটের এক নতুন সংজ্ঞার জন্ম দিয়েছে। তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১১৪ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়া ও বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার মুখে দাঁড়িয়ে তেহরান এখন এমন কিছু দাবি করছে, যা ওয়াশিংটন এবং তার পশ্চিমা মিত্রদের জন্য কেবল অপ্রত্যাশিতই নয়, বরং রীতিমতো ‘মাথায় বাজ পড়ার মতো’ এক ভূ-রাজনৈতিক সংকট তৈরি করেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন যখন যুদ্ধের ইতি টানতে ১৫ দফার একটি শান্তি পরিকল্পনা তেহরানের কাছে পাঠিয়েছিল, তখন অনেকেই মনে করেছিলেন ইরান হয়তো অবরোধ শিথিল বা পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে দরকষাকষি করবে। কিন্তু ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির প্রশাসন সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে হাঁটার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তেহরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, যুদ্ধ বন্ধ করতে হলে আগে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের পূর্ণ সার্বভৌমত্ব এবং কর্তৃত্ব স্বীকার করে নিতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান এই যুদ্ধে একটি বড় সত্য আবিষ্কার করেছে—আর তা হলো বিশ্ব অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেওয়া তাদের জন্য কতটা সহজ। বিশ্ব বাণিজ্যের প্রধান ধমনি এই হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়। ইরান এখন এই জলপথকে কেবল রণকৌশল নয়, বরং আয়ের এক স্থায়ী উৎস হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে।
ইরানি পার্লামেন্টে ইতোমধ্যে একটি বিল আনা হয়েছে, যার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি ব্যবহারকারী প্রতিটি জাহাজকে মোটা অঙ্কের ‘মাশুল’ দিতে হবে।
সিএনএন-এর হিসাব মতে, ইরান যদি সফলভাবে এই টোল ব্যবস্থা চালু করতে পারে, তবে তাদের মাসিক আয় প্রায় ৮০০ মিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে, যা মিশরের সুয়েজ খালের আয়ের সমান বা তার চেয়েও বেশি।
ইরানের এই দাবিকে ‘অবৈধ ও বিশ্বশান্তির জন্য বিপজ্জনক’ বলে আখ্যা দিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। ফ্রান্সের জি-৭ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘হরমুজ প্রণালিকে ব্যক্তিগত টোলগেটে পরিণত করার চেষ্টা আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন। এটি কেবল যুক্তরাষ্ট্রের সমস্যা নয়, বরং পুরো বিশ্বের স্বার্থের পরিপন্থি ও এর বিরুদ্ধে সম্মিলিত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
জনসমক্ষে কোনো দেশ বা শিপিং কোম্পানি টোল দেওয়ার কথা স্বীকার না করলেও, শিপিং গোয়েন্দা সংস্থা ‘লয়েডস লিস্ট’ দাবি করেছে, ইতোমধ্যে অন্তত ২০টি জাহাজ ইরানের তৈরি করা ‘নতুন করিডোর’ ব্যবহার করেছে। খবর পাওয়া গেছে, অন্তত দুটি বড় জাহাজ দুই মিলিয়ন ডলার করে মাশুল দিয়ে নিরাপদ পারাপার নিশ্চিত করেছে।
ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডস (আইআরজিসি) অনুমোদিত জাহাজের জন্য একটি আলাদা নিবন্ধন ব্যবস্থাও চালু করেছে বলে জানা গেছে।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক