বাড়ছে উত্তেজনা, আবার কি বাজবে যুদ্ধের দামামা?
মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে আবারও যুদ্ধের কালো মেঘ ঘনিয়ে আসছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা, ইসরায়েল-লেবানন সীমান্তে অস্থিরতা এবং জ্বালানি রুট ঘিরে অনিশ্চয়তা, সবমিলিয়ে অঞ্চলটি এখন এক জটিল ও বিপজ্জনক মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে।
বর্তমান সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি। প্রতিদিন বৈশ্বিক তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। সাম্প্রতিক সময়ে এই প্রণালিকে ঘিরে পরস্পরবিরোধী ঘোষণা পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে তুলেছে। কখনও ‘সম্পূর্ণ খোলা’ বলা হচ্ছে, আবার কিছুক্ষণের মধ্যেই শর্ত আরোপ বা হুমকি আসছে। ফলে আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানি ও জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা চরমে উঠেছে।
ইরান স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি তাদের বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ চালিয়ে যায়, তাহলে হরমুজ আবারও বন্ধ হয়ে যেতে পারে। অপরদিকে ওয়াশিংটন জানাচ্ছে, চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত অবরোধ বহাল থাকবে। দুই দেশের এই অবস্থান পরিস্থিতিকে যেকোনো সময় বিস্ফোরক করে তুলতে পারে।
এদিকে, গত সপ্তাহে ইউনাইটেড কিংডম মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএসটিও) জানায়, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের সময় দুটি জাহাজ হামলার শিকার হয়েছে। তাদের তথ্য অনুযায়ী, একটি তেলবাহী ট্যাংকারে ইরানি গানবোট থেকে গুলি ছোড়া হয় এবং একটি কনটেইনার জাহাজে অজ্ঞাত বস্তু আঘাত হানে।
শুক্রবার ইরান প্রণালিটি ‘সম্পূর্ণ খোলা’ ঘোষণা করলেও ২৪ ঘণ্টার কম সময়ের মধ্যে অবস্থান বদলায়। যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ চলমান থাকায় তেহরান আবারও সীমাবদ্ধতা আরোপ করে।
অপরদিকে, ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনা জানায়, মার্কিন অবরোধ ও ‘অবাস্তব শর্তের’ কারণে তেহরান এই আলোচনায় অংশ নেবে না। নতুন করে আলোচনা শুরুর লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র সোমবার পাকিস্তানে প্রতিনিধি দল পাঠানোর থাকলেও নিরাপত্তা সঙ্কায় তা স্থগিত করা হয়েছে।
এছাড়া উপসাগরীয় অঞ্চলে নৌ অবরোধের অংশ হিসেবে একটি ইরানি পতাকাবাহী কার্গো জাহাজ আটক করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে বলেন, ‘তৌস্কা’ নামের জাহাজটি সতর্কবার্তা অমান্য করায় মার্কিন নৌবাহিনী সেটিকে থামিয়ে জব্দ করে।
ট্রাম্পের দাবি, জাহাজটি প্রায় ৯০০ ফুট দীর্ঘ এবং অবরোধ ভেঙে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল। সতর্কবার্তা উপেক্ষা করায় মার্কিন নৌবাহিনী জাহাজটির ইঞ্জিন কক্ষে গুলি চালিয়ে সেটিকে অচল করে দেয় এবং পরে নিয়ন্ত্রণে নেয়।
তবে ইরান এ ঘটনাকে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন এবং ‘সশস্ত্র জলদস্যুতা’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে দ্রুত প্রতিশোধ নেওয়ার হুমকি দিয়েছে। দেশটির সামরিক সদর দপ্তর খাতাম আল-আনবিয়া’র এক মুখপাত্র বলেন, মার্কিন বাহিনী ওমান সাগরে ইরানের একটি বাণিজ্যিক জাহাজে গুলি চালিয়ে সেটিতে আরোহন করেছে, যা চুক্তির পরিপন্থী।
উভয় দেশের মধ্যে চলমান দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি বুধবার (২২ এপ্রিল) শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। এর আগে ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত প্রথম দফার আলোচনাও কোনো সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয়।
এদিকে, ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে ১০ দিনের যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও বাস্তবে সংঘাত থেমে নেই। সীমান্তবর্তী এলাকায় গোলাগুলি, হামলা ও পাল্টা হামলার ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। ইসরায়েল ইতোমধ্যে দক্ষিণ লেবাননে তথাকথিত ‘ইয়েলো লাইন’ নির্ধারণ করেছে, যা অনেকটা গাজার মতো নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা তৈরি করছে বলে বিশ্লেষকদের আশঙ্কা।
অন্যদিকে লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ সতর্ক করে বলেছে- যুদ্ধবিরতি একতরফা নয়; উভয় পক্ষকেই তা মানতে হবে। ফলে যেকোনো ছোট ঘটনা বড় সংঘর্ষে রূপ নিতে পারে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ছে। ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য যৌথভাবে একটি প্রতিরক্ষামূলক বহুজাতিক মিশনের প্রস্তাব দিয়েছে, যার লক্ষ্য হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ নৌচলাচল নিশ্চিত করা। তবে এই উদ্যোগ কার্যকর হবে কি না, তা নির্ভর করছে যুদ্ধবিরতি টেকসই হয় কিনা এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতায় পৌঁছাতে পারে কিনা তার ওপর।
একই সময়ে, পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা চললেও এখনো স্থায়ী কোনো সমাধানের ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। উভয় পক্ষই একে অপরের ওপর অবিশ্বাস প্রকাশ করছে, যা আলোচনাকে আরও জটিল করে তুলছে।
এই অস্থিরতার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য শান্তি আলোচনাকে ঘিরে মিশ্র সংকেত এবং হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে গেছে।
বিশ্ববাজারের প্রধান সূচক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম আজ সোমবার (২০ এপ্রিল) এশিয়ার বাজারে ৭ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পায়। পরে কিছুটা কমলেও সকালে প্রতি ব্যারেল দাম দাঁড়ায় ৯৪.৬৯ ডলার, যা শুক্রবারের (১৭ এপ্রিল) ৯০.৪০ ডলারের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বেশি।
এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে মূল কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষণা। তিনি জানান, মার্কিন বাহিনী ইরানের পতাকাবাহী একটি কার্গো জাহাজ জব্দ করেছে, যা দেশটির ওপর আরোপিত নৌ অবরোধ এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল।
এছাড়াও জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। শিপিং খাতে ঝুঁকি বেড়েছে এবং অনেক দেশ জরুরি মজুত ব্যবহারে বাধ্য হচ্ছে। বিশেষ করে এশিয়া ও ইউরোপের দেশগুলো, যারা মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল, তারা সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে পড়েছে।
অপরদিকে উভয় পক্ষই সামরিক প্রস্তুতি জোরদার করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী উপসাগরীয় অঞ্চলে সক্রিয়, অন্যদিকে ইরানও তাদের প্রতিরক্ষা ও আক্রমণাত্মক সক্ষমতা প্রদর্শন করছে। বিশ্লেষকদের মতে, ভুল বোঝাবুঝি বা ছোট কোনো সংঘর্ষ দ্রুত বড় যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। বিশেষ করে যখন এতগুলো পক্ষ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে জড়িত।
মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকট এখন শুধু আঞ্চলিক ইস্যু নয়- এটি বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সবকিছু এখন নির্ভর করছে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা কতটা সফল হয় এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো কতটা সংযম দেখাতে পারে তার ওপর। এই প্রশ্ন এখনো অমীমাংসিত- উত্তেজনার এই আগুন কি নিভবে, নাকি সত্যিই আবার বাজবে যুদ্ধের দামামা?

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক