যুক্তরাষ্ট্র কি সত্যিই ইসরায়েল থেকে দূরে সরে যাচ্ছে?
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত এবং ইরানকে ঘিরে কূটনৈতিক সমীকরণের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মধ্যে বাড়তে থাকা মতবিরোধের কারণে বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, ওয়াশিংটন হয়তো দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েলের প্রতি তাদের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করতে পারে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তির চেষ্টা চালাচ্ছে। তেহরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, যেকোনো চুক্তির পূর্বশর্ত হলো দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান বন্ধ করা। কিন্তু নেতানিয়াহু সরকার লেবাননে হামলা অব্যাহত রাখায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে কৌশলগত মতবিরোধ আরও প্রকট হয়েছে। খবর আল জাজিরার।
গত মাসে প্রকাশিত একটি ফোনালাপের তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প লেবাননে হামলা বন্ধ করতে অস্বীকৃতি জানানোয় নেতানিয়াহুকে তীব্র ভর্ৎসনা করেন।
প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে ‘পাগল’ বলে উল্লেখ করেন এবং বলেন, আমি না থাকলে তুমি এখন জেলেই থাকতে। এখন সবাই তোমাকে ঘৃণা করে, এমনকি ইসরায়েলকেও।
সম্প্রতি অ্যাক্সিওসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, নেতানিয়াহু জানেন, বস কে। বিশ্লেষকদের মতে, এই মন্তব্য দুই নেতার সম্পর্কের অবনতির স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে।
অন্যদিকে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও ইসরায়েলি মন্ত্রীদের সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের করদাতাদের অর্থেই ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বড় অংশ গড়ে উঠেছে, তাই ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্তের সমালোচনায় সতর্ক থাকা উচিত।
সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, শুধু ডেমোক্র্যাট নয়, রিপাবলিকানদের একটি অংশ এবং ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’ আন্দোলনের অনেক সমর্থকও ইসরায়েলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের অন্ধ সমর্থনের বিরোধিতা করছেন।
রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য মার্জোরি টেইলর গ্রিন প্রকাশ্যে ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তার সমালোচনা করেছেন।
এছাড়া সাবেক টেলিভিশন উপস্থাপক টাকার কার্লসন অভিযোগ করেন, ইসরায়েল ট্রাম্পকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়ে লেবাননে নতুন সংঘাতের পথ তৈরি করেছে।
২০১৬ সালে দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ১০ বছরে ৩৮ বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়, যা ওয়াশিংটনের ইতিহাসে কোনো মিত্র দেশের জন্য সবচেয়ে বড় সামরিক সহায়তা চুক্তি।
এছাড়া আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও যুক্তরাষ্ট্র বারবার ইসরায়েলের পাশে দাঁড়িয়েছে। গাজা যুদ্ধকে কেন্দ্র করে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ইসরায়েলের পক্ষে একাধিকবার ভেটো দিয়েছে ওয়াশিংটন।
ইসরায়েলে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতিকে বড় ইস্যুতে পরিণত করেছেন।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইয়াইর লাপিদ সতর্ক করে বলেছেন, বর্তমান সরকার দ্রুত পরিবর্তন না হলে ইসরায়েলের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বে।
এদিকে সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকট অভিযোগ করেছেন, প্রধানমন্ত্রীর কূটনৈতিক ব্যর্থতার কারণেই যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে পাশ কাটিয়ে ইরানের সঙ্গে সরাসরি সমঝোতার পথে এগোচ্ছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, সম্পর্কের টানাপোড়েন বাড়লেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের কৌশলগত জোট ভেঙে যাওয়ার সম্ভাবনা এখনই নেই।
মার্কিন কূটনীতিক ও বিশ্লেষক অ্যারন ডেভিড মিলার বলেন, অতীতেও মার্কিন প্রেসিডেন্টদের সঙ্গে ইসরায়েলের মতবিরোধ হয়েছে, তবে এবার তা অনেক বেশি প্রকাশ্যে এসেছে।
তার ভাষায়, ট্রাম্প যদি ইসরায়েলের ওপর সত্যিকারের চাপ সৃষ্টি করেন, তবে তা হবে এমন কোনো বড় কূটনৈতিক সাফল্যের জন্য, যা তাকে রাজনৈতিকভাবে লাভবান করবে। বর্তমানে গাজা, লেবানন কিংবা সৌদি-ইসরায়েল সম্পর্ক—কোনো ক্ষেত্রেই এমন অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না, যার জন্য ওয়াশিংটন কঠোর অবস্থান নেবে।
বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্কে টানাপোড়েন বাড়লেও সামরিক ও কৌশলগত স্বার্থের কারণে দুই দেশের ঐতিহাসিক জোট এখনই ভেঙে পড়ার সম্ভাবনা কম। তবে ইরান, লেবানন এবং মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে ঘিরে এই সম্পর্ক নতুন এক পরীক্ষার মুখোমুখি হয়েছে।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক