ন্যাটো সম্মেলনে আরও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা চাইবেন জেলেনস্কি
রাশিয়ার ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখে ইউক্রেনের জন্য আরও উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে চান প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। সে লক্ষ্য ন্যাটো সদস্য দেশগুলোর প্রতি জোরালো আহ্বান জানাতে যাচ্ছেন তিনি।
আজ মঙ্গলবার (৭ জুলাই) তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় শুরু হওয়া ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নিয়ে তিনি ইউক্রেনের মিত্রদের কাছে অতিরিক্ত প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ইন্টারসেপ্টর মিসাইল এবং যৌথ প্রতিরক্ষা উৎপাদনে সহায়তা চাইবেন বলে জানা গেছে। খবর বিবিসির।
জেলেনস্কির এই আবেদন এমন এক সময় এসেছে, যখন মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে রাশিয়া দুই দফায় দেশটির রাজধানী কিয়েভে ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে।
সাম্প্রতিক হামলাগুলোতে বহুতল আবাসিক ভবন ধসে পড়েছে এবং নারী-শিশুসহ অর্ধশতাধিক বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও বহু।
ইউক্রেনের দাবি, রাশিয়া পরিকল্পিতভাবে বেসামরিক এলাকা লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের লঙ্ঘন।
ন্যাটো সম্মেলনের ফাঁকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকেরও আশা করছেন জেলেনস্কি।
তিনি ট্রাম্পকে বোঝানোর চেষ্টা করবেন, রাশিয়ার সাম্প্রতিক ব্যাপক হামলা তাদের শক্তির নয়, বরং দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ। একই সঙ্গে তিনি পশ্চিমা দেশগুলোর প্রতি রাশিয়ার ওপর আরও কূটনৈতিক ও সামরিক চাপ বাড়ানোর আহ্বান জানাবেন, যাতে মস্কো অর্থবহ শান্তি আলোচনায় বসতে বাধ্য হয়।
জেলেনস্কির ভাষায়, ইউক্রেন এমন একটি ‘মর্যাদাপূর্ণ শান্তি’ চায়, যেখানে দেশের সার্বভৌমত্ব ও ভূখণ্ডের অখণ্ডতা অক্ষুণ্ন থাকবে।
অন্যদিকে, ইউক্রেনও সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়ার অভ্যন্তরে ড্রোন হামলা জোরদার করেছে।
ইউক্রেনীয় বাহিনীর হামলায় রাশিয়ার বিভিন্ন তেল শোধনাগার, সামরিক স্থাপনা, জ্বালানি অবকাঠামো ও বিদ্যুৎ কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে জ্বালানি সংকট, বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং দীর্ঘ সময় পেট্রোল পাম্পে লাইনের সৃষ্টি হয়েছে।
মস্কোর মেয়র সের্গেই সোবিয়ানিন জানিয়েছেন, রাজধানীর দিকে ছোড়া প্রায় ৪৩০টি ইক্রেউনীয় ড্রোনের অধিকাংশই বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভূপাতিত করেছে। তবে হামলায় কতটা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা এখনও পুরোপুরি জানা যায়নি।
ইউক্রেনের বিমান বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ড্রোন প্রতিহত করতে তারা সফল হলেও রাশিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে বড় ধরনের সমস্যায় পড়ছে।
সোমবারের (৬ জুলাই) হামলায় ছোড়া একটিও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করতে পারেনি ইউক্রেন।
বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঘণ্টায় কয়েক হাজার কিলোমিটার গতিতে উড়ে আসে। এগুলো প্রতিহত করতে অত্যাধুনিক মার্কিন প্যাট্রিয়ট এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম প্রয়োজন, যা বর্তমানে ইউক্রেনের কাছে পর্যাপ্ত পরিমাণে নেই।
জেলেনস্কি বলেন, আজকের বিশ্বে মানুষের জীবন রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় পরিমাণে ব্যালিস্টিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা উৎপাদন না হওয়া সত্যিই অযৌক্তিক।
জেলেনস্কি ইউরোপীয় দেশগুলোর প্রতি তাদের নিজস্ব প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত ইউক্রেনকে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
তার যুক্তি, গুদামে মজুত করে রাখার চেয়ে বর্তমানে ইউক্রেনের শহর ও সাধারণ মানুষের জীবন রক্ষায় এসব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করা বেশি জরুরি।
একই সঙ্গে ন্যাটোর সহায়তায় ইউক্রেনেই নিজস্ব আধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরির উদ্যোগ নিয়েও আলোচনা করতে চান তিনি।
ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুটে সদস্য দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ইউক্রেনের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় প্রয়োজনীয় সামরিক সহায়তা নিশ্চিত করতে সবাইকে দায়িত্ব নিতে হবে।
তার মতে, ইউক্রেন বর্তমানে যুদ্ধক্ষেত্রে নতুন কৌশল প্রয়োগ করে পরিস্থিতির মোড় ঘোরানোর চেষ্টা করছে এবং মিত্রদের সহযোগিতা অব্যাহত থাকলে সেই প্রচেষ্টা আরও জোরালো হবে।
জেলেনস্কি মনে করেন, রাশিয়ার ভেতরে ইউক্রেনের দূরপাল্লার ড্রোন হামলা ক্রেমলিনের ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ সৃষ্টি করেছে।
বিশেষ করে সাইবেরিয়ার ওমস্কসহ রাশিয়ার গভীরে তেল শোধনাগার, সামরিক স্থাপনা এবং অধিকৃত ক্রিমিয়ায় জ্বালানি ও বিদ্যুৎ অবকাঠামোয় হামলার ফলে মস্কো নতুন করে নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
ইউক্রেনের আশা, সামরিক ও কূটনৈতিক এই দ্বিমুখী চাপ শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে বাস্তবসম্মত শান্তি আলোচনায় বসতে বাধ্য করবে।
তবে কিয়েভ স্পষ্ট করে জানিয়েছে, তারা কোনোভাবেই পূর্বাঞ্চলের ডনবাস অঞ্চল পুরোপুরি রাশিয়ার কাছে ছেড়ে দেওয়ার শর্ত মেনে নেবে না।
ইউক্রেন সরকার বলছে, কঠিন শীত মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই যুদ্ধের একটি টেকসই সমাধান প্রয়োজন।
সেই লক্ষ্য অর্জনে পশ্চিমা দেশগুলোর কাছ থেকে আরও উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্র এবং সামরিক সহযোগিতা পাওয়াকে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে কিয়েভ।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক