মধ্যস্থতার পর যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ১০ বিলিয়ন ডলার চায় পাকিস্তান
যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ১০ বিলিয়ন ডলারের এক্সচেঞ্জ স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ড (ইএসএফ) চেয়েছে পাকিস্তান। এ প্রস্তাব অনুমোদিত হলে অর্থ সংকটে থাকা দক্ষিণ এশিয়ার এ দেশটির অর্থনীতির পুনরুজ্জীবনের একটি উপায় হতে পারে। আজ বুধবার (২২ জুলাই) বিষয়টি সম্পর্কে অবগত একটি সূত্রের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
এক্সচেঞ্জ স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ড (ইএসএফ) হলো মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ পরিচালিত একটি জরুরি রিজার্ভ অ্যাকাউন্ট। ১৯৩৪ সালে কংগ্রেস এটি প্রতিষ্ঠা করে। এটির উদ্দেশ্য হলো বৈশ্বিক মুদ্রার মান স্থিতিশীল করা, বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে হস্তক্ষেপ করা এবং বিদেশি সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে অস্থায়ী অর্থায়ন প্রদান করা।
যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা রাখায় পাকিস্তানের কূটনৈতিক মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। এতে দেশটির ওয়াশিংটন ও অন্যান্য অংশীদারদের কাছ থেকে অর্থনৈতিক সুবিধা আদায়ের আশা জেগেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টের কাছে করা এক আবেদনে ইসলামাবাদ যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তান সরকারের মধ্যে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর মেয়াদি ১০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের দ্বিপাক্ষিক মুদ্রা বিনিময় স্থিতিশীলতা সহায়তার সুবিধা চেয়েছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের কর্মসূচির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে ইসলামাবাদ কঠোর রাজস্ব ও মুদ্রানীতি গ্রহণ করলেও যুক্তরাষ্ট্রের কাছে চাওয়া ইএসএফ সুবিধা পাকিস্তানের রিজার্ভ শক্তিশালী করবে, রুপির ওপর চাপ কমাবে এবং বহুপাক্ষিক অর্থায়নের ওপর নির্ভরতা হ্রাস করবে।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় অবশ্য পাকিস্তানের করা এ অনুরোধের বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। এ ছাড়া বিষয়টি নিয়ে রয়টার্সের অনুরোধে পাকিস্তানের অর্থ মন্ত্রণালয় তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অনুরোধের বিষয়টি উল্লেখ না করে অর্থ মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, পাকিস্তানের অর্থমন্ত্রী মুহাম্মদ আওরঙ্গজেব মঙ্গলবার ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী বেসেন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। এরপর মুহাম্মদ আওরঙ্গজেব বলেছেন, তিনি আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক ঘটনাবলির পরিপ্রেক্ষিতে পাকিস্তানের অর্থনীতির দুর্বলতার বিষয়টি উত্থাপন করেছেন।
বিবৃতিতে বলা হয়, আওরঙ্গজেব আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজারে শক্তিশালী প্রবেশাধিকার, উচ্চতর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং বর্ধিত সার্বভৌম ক্রেডিট রেটিং সমর্থিত পাকিস্তানের বাজারমুখী যাত্রার জন্য যুক্তরাষ্ট্র থেকে বড় ধরনের সমর্থন চেয়েছেন। বৈঠকে উভয় পক্ষ দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও গভীর করা, মার্কিন বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা এবং কৌশলগত প্রকল্পগুলো এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রতি নিজেদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে।
পাকিস্তান সাত বিলিয়ন ডলারের আইএমএফ সুপারিশকৃত ব্যবস্থার অধীনে রয়েছে। এর ফলে দেশটির সরকারকে রাজনৈতিকভাবে জনপ্রিয়তা কমাবে এমন কর বৃদ্ধি, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও সংস্কার করতে হয়েছে।
মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ এক্সচেঞ্জ স্টেবিলাইজেশন ফ্যাসিলিটির (ইএসএফ) আওতায় একটি দেশের রিজার্ভ ও মুদ্রার বিনিময় হারের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ডলার, বিনিময় অথবা নিশ্চয়তা প্রদান করে। এ ব্যবস্থা মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের কিছু প্রধান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে থাকা স্থায়ী ডলার বিনিময় লাইন থেকে ভিন্ন। এটি আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে মার্কিন ডলারের একটি আন্তর্জাতিক সরবরাহ লাইন হিসেবে কাজ করে।
২০২৫ সালের আর্জেন্টিনায় এ ধরনের প্যাকেজ প্রদান করা হয়েছিল। ২০০২ সালে উরুগুয়েকে মুদ্রা বিনিময় স্থিতিশীলকরণ সুবিধা দেওয়া হয়েছিল। এ ছাড়া মেক্সিকোকে ১৯৪০-এর দশকে দেওয়া দীর্ঘস্থায়ী বিনিময় সুবিধার বর্তমান আকার ৯ বিলিয়ন ডলার।
২০২৩ সালে পাকিস্তান আইএমএফের সঙ্গে তিন বিলিয়ন ডলারের একটি চুক্তির সহায়তায় অল্পের জন্য ঋণখেলাপি হওয়া থেকে বেঁচে যায়। পরবর্তীতে দেশটি জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়াতে সাত বিলিয়ন ডলারের সম্প্রসারিত ফান্ড সুবিধার পাশাপাশি আরও ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার ঋণ পায়। তবে দেশটির রিজার্ভ এখনও চীন ও সৌদি আরব সরকারের অর্থায়ন, নবায়ন এবং আমানতের ওপর নির্ভরশীল।
এপ্রিলে পাকিস্তান রিজার্ভের এক-পঞ্চমাংশ, অর্থাৎ প্রায় ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার সংযুক্ত আরব আমিরাতকে পরিশোধ করে। এজন্য ইসলামাবাদ দ্বিপাক্ষিক সমর্থনের পরিবর্তন এবং আইএমএফের অর্থ ছাড়ে বিলম্বের ঝুঁকিতে পড়ে। পরে সৌদি আরব দেশটিকে নতুন করে ৩ বিলিয়ন ডলার সহায়তা প্রদান করে।
পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক গত জানুয়ারিতে বলেছে, রিজার্ভ ২০২১ সালের রেকর্ডের কাছাকাছি ফিরতে পারে এবং ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ তা ২০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন
যুক্তরাষ্ট্রের এক্সচেঞ্জ স্টেবিলাইজেশন ফ্যাসিলিটি (ইএসএফ) পাকিস্তানে তারল্যের জোগান ও রাজনৈতিক সংকেত উভয় ক্ষেত্রেই গুরুত্ব বহন করবে। এটি রিজার্ভ ও পাকিস্তানি রুপির ওপর চাপ কমাবে। একই সঙ্গে পাকিস্তানের অনুরোধটি যুক্তরাষ্ট্র গ্রহণ করলে আইএমএফের কিস্তি এবং বিশেষ উদ্ধার সহায়তার ওপর দক্ষিণ এশিয়ার এ দেশটির নির্ভরতা কমবে।
পাকিস্তান সরকার আইএমএফ-সমর্থিত সংস্কারগুলোর মাধ্যমে রাজনৈতিকভাবে মূল্য দিয়ে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করেছে। এসব সংস্কারের মধ্যে রয়েছে উচ্চ কর আরোপ, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং উন্নয়ন বা জনকল্যাণমূলক ব্যয় সীমিত করা।
বিভিন্ন দেশের ঋণগ্রহণের যোগ্যতা মূল্যায়নকারী সংস্থা রেটিং এজেন্সি ফিচ গত এপ্রিলে জানায়, আইএমএফের কর্মসূচিতে পাকিস্তানের নির্ভরশীলতা দেশটির তহবিল সংগ্রহের সক্ষমতাকে শক্তিশালী করেছে, অন্যদিকে পুনর্গঠিত বৈদেশিক মুদ্রার মজুত মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে সৃষ্ট অর্থনৈতিক ধাক্কা থেকে সুরক্ষা প্রদান করেছে।
ফিচ অবশ্য সতর্ক করে বলেছে, ক্রমবর্ধমান জ্বালানি খরচ এবং সম্ভাব্য সরবরাহ ব্যাঘাত দেশটির বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ মারাত্মকভাবে কমাতে পারে।
বারবার বৈশ্বিক সংকট, নীতিগত অনিশ্চয়তা, নিরাপত্তা ঝুঁকি, আগের মুনাফা প্রত্যাবাসনে বিধিনিষেধ এবং সীমিত রপ্তানির কারণে পাকিস্তানে বৈদেশিক বিনিয়োগ কমই রয়ে গেছে। অন্যদিকে, দেশটির ক্রেডিট রেটিং ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায়ে থাকায় ঋণের ব্যয় বেশি এবং বাজারে প্রবেশাধিকার সীমিত পর্যায়ে রয়েছে।
পাকিস্তান ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে তাদের সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে এসব সমস্যার কিছুটা সমাধানের চেষ্টা করেছে। এতে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বর্তমানে ক্রিপ্টো, রিয়েল এস্টেট ও খনি খাত পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পরিবারের প্রধান ক্রিপ্টো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফিনান্সিয়ালের একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পাকিস্তান আন্তঃসীমান্ত লেনদেনের জন্য মুদ্রা স্থিতিশীলতার চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এ ছাড়া মার্কিন সরকারের সঙ্গে নিউইয়র্কে অবস্থিত পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্সের মালিকানাধীন বন্ধ হয়ে যাওয়া রুজভেল্ট হোটেলটি পুনর্নির্মাণের জন্য একটি সমঝোতা স্মারকও স্বাক্ষরের চেষ্টা চলছে। তাছাড়া খনিতে মার্কিন বিনিয়োগ আকর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে। ইতোমধ্যে পাকিস্তানের রেকো ডিক খনিতে মার্কিন এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংক ১ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলার অর্থায়নের ঘোষণা দিয়েছে।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক