গাজা নিয়ে ইসরায়েলের মন্ত্রীর মন্তব্যে জার্মানিতে নিন্দার ঝড়
গাজায় বসবাসরত ফিলিস্তিনিদের হত্যার কথা বলে ইসরায়েলের নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গেভির এখন তোপের মুখে৷ বেশ কিছু দেশে আগে থেকেই নিষিদ্ধ কট্টর ডানপন্থি এই রাজনীতিবিদকে নিষিদ্ধের দাবি উঠেছে জার্মানিতেও৷
ইতোমধ্যে তার মন্তব্যের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ ম্যার্ৎস৷ ম্যার্ৎসের নেতৃত্বাধীন জোট সরকার, সরকার-বিরোধী শিবির, খ্রিষ্টান এবং ইহুদিদের সংগঠন থেকেও উঠেছে নিন্দার ঝড়৷
এমন বক্তব্য কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় : ম্যার্ৎস
চ্যান্সেলর ম্যার্ৎস এই মুহূর্তে ছুটিতে৷ তা সত্ত্বেও বেন-গেভিরের উগ্র মন্তব্যের কঠোর নিন্দা জানিয়েছেন তিনি৷
সোমবার ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গেভির বলেন, ‘‘আমি মনে করি গাজায় সুনির্দিষ্টভাবে লক্ষ্য করে হত্যা চালানো উচিত৷” বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মন্ত্রিসভার কট্টরপন্থি সদস্য হত্যার পরিকল্পনাও স্পষ্টভাবে তুলে ধরে বলেন, ‘‘প্রতি রাতে ৩০ বা ৪০ জন ফিলিস্তিনিকে ‘সরিয়ে ফেলা' উচিত৷'' এরপর কোন ধরনের মানুষকে হত্যার কথা বলছেন তা-ও স্পষ্ট করেছেন বেন গেভির৷ তিনি বলেন, তাৎক্ষণিক হুমকির কারণ- এমন সশস্ত্র ফিলিস্তিনিই নয়, গাজা উপত্যকায় এমন মানুষও রয়েছে, যাদের বেঁচে থাকা প্রাপ্য নয়৷
গতকাল বুধবার এক বিবৃতিতে বেন গেভিরের বক্তব্যের তীব্র নিন্দা জানিয়ে ফ্রিডরিশ ম্যার্ৎস বলেন, ‘‘এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন এবং তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়৷”
বার্লিনে ম্যার্ৎসের এক মুখপাত্র জানান, বিবৃতিতে অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের বসতি স্থাপনের গতি বাড়ানোর পরিকল্পনারও সমালোচনা করেছেন জার্মানির চ্যান্সেলর৷ ম্যার্ৎস ‘গভীর উদ্বেগের' সঙ্গে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন জানিয়ে মুখপাত্র আরো বলেন, গাজার ভূখণ্ড দখলের আর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া উচিত নয়, বরং ‘‘দখলদার শক্তি হিসেবে ইসরায়েলকে ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে মর্যাদাপূর্ণ আচরণ করতে হবে, তাদের সম্পত্তির সুরক্ষা দিতে হবে এবং জনপ্রশাসন ও মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে৷”
মধ্য-বামপন্থি সোশাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (এসপিডি)-র নেতা, ফ্রিডরিশ ম্যার্ৎসের ডেপুটি এবং অর্থমন্ত্রী লার্স ক্লিংবাইল একদিন আগেই বেন-গেভিরের বিরুদ্ধে যথাযথ পদক্ষেপের দাবি জানান৷ মঙ্গলবার জার্মানির বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল স্যাট-ওয়ান-কে তিনি বলেন, ‘‘ফেডারেল সরকার হয়ে আমরা কোনোভাবেই এ ধরনের বক্তব্য মেনে নিতে পারি না৷”
এ সময় লার্স ক্লিংবাইল জানান, বেন-গেভিরকে ইউরোপীয় পর্যায়ে নিষিদ্ধ করার বিষয়ে আলোচনা চলছে৷ ‘‘বিষয়টি খুব গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন-” এমন মন্তব্য করে ক্লিংবাইল আরও বলেন, ইসরায়েল রাষ্ট্রের প্রতি পূর্ণ সংহতি থাকা সত্ত্বেও জার্মানি এ বিষয়ে নীরব থাকতে পারে না, কারণ, এখন এতটা সীমা অতিক্রম করা হয়েছে, যা একেবারে অগ্রহণযোগ্য৷”
ইউরোপীয় পার্লামেন্টে জার্মানির রক্ষণশীল দল ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্র্যাটিক ইউনিয়ন (সিডিইউ)-এর সদস্য হিল্ডগার্ড বেন্টেলে জানিয়েছেন, তিনিও বেন-গেভিরের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পক্ষে৷ গত এক বছর ধরে এ দাবি জানিয়ে আসছেন জানিয়ে ডয়চে ভেলেকে তিনি বলেন, ‘‘ইউরোপে কোনো ব্যক্তিকে (রাজনৈতিক বা অন্য কোনো কারণে) নির্মূল বা নিশ্চিহ্ন করতে চাওয়া সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য৷”
ইসরায়েলে অস্ত্র রপ্তানি বন্ধ ও নিষেধাজ্ঞার দাবি
জার্মান সংসদের বিরোধী দল গ্রিন পার্টি জানিয়েছে, তারাও বেন-গেভিরের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের পক্ষে৷ পরিবেশবাদী দলটির নেত্রী ফ্রানৎ্সিসকা ব্রান্টনার সংবাদমাধ্যম পলিটিকো-কে বলেন, ‘‘আমি ফেডারেল সরকারের প্রতি ওই ব্যক্তির (জার্মানিতে) প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বান জানাচ্ছি৷ (আমি চাই) ইউরোপীয় পর্যায়েও যেন অনুরূপ নিষেধাজ্ঞার জোর প্রচেষ্টা চালানো হয়৷”
গ্রিন পার্টির নেত্রী আরও বলেন, বেন গেভির এবার ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সহিংসতা উসকে দেওয়ার মতো বক্তব্যের কারণে আলোচনায় এলেও উগ্র বক্তব্য এর আগেও তিনি রেখেছেন৷ তাই আরো কিছু দেশ যেভাবে বেন-গেভিরকে নিষিদ্ধ করেছে, জার্মানিকেও সেই দৃষ্টান্ত অনুসরণ করার আহ্বান জানিয়ে ফ্রানৎ্সিসকা ব্রান্টনার বলেন, ‘‘জার্মানিরও সেই দেশগুলোর কাতারে শামিল হওয়ার সময় এসেছে৷”
বেন-গেভিরের মন্তব্যে জার্মানির লেফট পার্টিও ক্ষুব্ধ৷ দলের লেয়া রাইজনার পাবলিক রেডিও ডয়েচলান্ডফুঙ্ক-কে বলেছেন, বক্তব্যের জন্য ইসরায়েল সরকারের ওই মন্ত্রীর পাশাপাশি সরকারের বিরুদ্ধেও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত৷ তিনি মনে করেন, ইসরায়েলে সব ধরনের অস্ত্র রপ্তানি বন্ধ করা উচিত জার্মানির৷
ইহুদি ও খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের সংগঠনের নিন্দা
বেন-গেভির ফিলিস্তিনিদের হত্যা করার আহ্বান জানানোয় জার্মানিতে ইহুদিদের কেন্দ্রীয় পরিষদও তীব্র ক্ষোভ ও বিস্ময় প্রকাশ করেছে৷ কেন্দ্রীয় পরিষদের সভাপতি ইয়োসেফ শুস্টার ক্যাথলিক নিউজ এজেন্সিকে বলেন, বেন-গেভিরের বক্তব্য ইহুদি মূল্যবোধের সম্পূর্ণ পরিপন্থি এবং এমন বক্তব্য ইসরায়েলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করেছে৷ ইতামার বেন-গেভিরের আচরণকে ‘অত্যন্ত লজ্জাজনক ও দায়িত্বজ্ঞানহীন’ আখ্যা দিয়ে তিনি আরও বলেন, এ ঘটনা উগ্র-ডানপন্থি শক্তিগুলোর বিপজ্জনক রূপই তুলে ধরে৷
জার্মানির প্রোটেস্ট্যান্ট চার্চ কাউন্সিলের চেয়ারপার্সন কার্স্টেন ফেয়াহ্রসও ক্ষুব্ধ৷ বেন-গেভিরের বক্তব্যকে ‘মানবতার ওপর আঘাত' হিসেবে উল্লেখ করে সামাজিক যোগাযোম মাধ্যমে তিনি লিখেছেন, প্রতিটি মানুষেরই মর্যাদা রয়েছে- এ বিশ্বাস সব ধর্মের মানুষের মধ্যে থাকা প্রয়োজন৷ এই মর্যাদা কেউ দিতে পারে না, আবার কেউ তা কেড়েও নিতে পারে না৷”
যেসব দেশে নিষিদ্ধ বেন-গেভির
অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, ক্যানাডা, নিউজিল্যান্ড, নরওয়ে, নেদারল্যান্ডসসহ বেশ কিছু দেশ ইতিমধ্যে বেন-গেভিরের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে৷ সেই নিষেধাজ্ঞার অর্থ হলো, ইসরায়েলের নিরাপত্তা মন্ত্রী চাইলেও সেই দেশগুলোতে যেতে পারবেন না৷
জার্মানির সংসদের নিম্নকক্ষ বুন্ডেস্টাগে রক্ষণশীল সংসদীয় দলের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক মুখপাত্র ইয়্যুর্গেন হার্ড্ট চান ইউরোপীয় ইউনিয়নও একই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করুক৷ জার্মানির সংবাদ বিষয়ক ম্যাগাজিন পলিটিকোকে তিনি বলেন, মানবিক মর্যাদা ও মানবাধিকারের সর্বজনীন স্বীকৃতির বার্তা হিসেবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের উচিত তার (বেন গেভির) ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা৷ ইয়্যুর্গেন হার্ড্ট মনে করেন, ইসরায়েলের মন্ত্রিসভা থেকেও বাদ দেয়া উচিত বেন-গেভিরকে, কারণ, তাকে ছাড়া ইসরায়েলের যে মন্ত্রিসভা হবে তা ইউরোপ ও ইসরায়েলকে আবার কাছাকাছি যেতে সহায়তা করবে৷

ডয়চে ভেলে