নেপালে টানেলে আটকে পড়া শ্রমিকদের উদ্ধারে প্রাণান্তকর চেষ্টা
নেপাল-চীন সীমান্তে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার পর ধ্বংসাবশেষে তলিয়ে যাওয়া একটি টানেলে আটকে পড়া জলবিদ্যুৎ কর্মীদের কাছে পৌঁছাতে নেপালের উদ্ধারকারীরা ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার শুরু করেছেন। এর আগে বৃষ্টি ও নদীর পানি বেড়ে যাওয়ার ফলে উদ্ধারকারীদের প্রচেষ্টায় ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়।
নেপালের জ্বালানি মন্ত্রণালয় রোববার (৩০ আগস্ট) এক আপডেটে জানিয়েছে, ‘চারটি ছিদ্র করার কাজ সম্পন্ন হয়েছে... এখন সরাসরি টানেলে প্রবেশ করার প্রস্তুতি চলছে... এবং অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান জোরদার করা হচ্ছে।’ খবর বার্তা সংস্থা এএফপির।
বুধবারের ভয়াবহ বন্যার পর থেকে আজ পঞ্চম দিনে গড়িয়েছে উদ্ধার অভিযান, তবে উদ্ধারকারী দলগুলো দুর্যোগপূর্ণ এলাকাগুলোতে প্রতিকূল পরিস্থিতির সঙ্গে লড়াই করে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
নেপালের সরকার জানিয়েছে, বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কয়েকটি টানেলের ভেতরে ১০০ জনেরও বেশি শ্রমিক এখনো জীবিত ও আটকে থাকতে পারেন। হিমালয়ের নদী উপত্যকার ত্রিশূলী ৩-এ এবং ৩-বি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে উদ্ধার প্রচেষ্টা জোরদার করা হয়েছে।
নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের মতে, বুধবার সকালে কাদা ও ধ্বংসাবশেষের তোড় নেমে আসার পর থেকে নিখোঁজ ৯৩৩ জন জলবিদ্যুৎ কর্মীর মধ্যে তারাও রয়েছেন।
গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় ত্রিশূলী ৩-এ-তে ড্রিল ব্যবহার করে সেনাবাহিনীর উদ্ধারকারী দলগুলো প্রথমে কাদা-ভরা টানেলের উপরের অংশে পৌঁছাতে সক্ষম হয় এবং সেখানে বাতাস পাম্প করা ও ক্যামেরা পাঠানো শুরু করে।
আজ রোববার ভোরের দিকে রাতভর হওয়া বৃষ্টি এবং নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে খনন এলাকা পানিতে ভেসে গিয়ে তাদের প্রচেষ্টা ব্যাহত হয়, তবে পরে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়।
নেপালের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, উদ্ধারকারী দলগুলো এরপর ড্রিলিং মেশিন, এক্সকেভেটর, হাইড্রোলিক কাটার এবং অন্যান্য সরঞ্জাম ব্যবহার করে পুনরায় কাজ শুরু করে।
দেশটির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা দপ্তর থেকে প্রাপ্ত ছবিগুলোতে দেখা যায়, উদ্ধারকর্মীরা বন্যার পর থেকে যাওয়া থকথকে কাদা এবং বিশাল বিশাল পাথরের মধ্য দিয়ে কষ্ট করে পথ তৈরি করছেন।
নেপালের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, উদ্ধারকারী দলগুলো কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হলেও আটকে থাকা ব্যক্তিদের সন্ধান ও উদ্ধারে অক্লান্ত প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এতে আরও বলা হয়, উদ্ধারকারী দলগুলো অত্যাধুনিক সার্চ ক্যামেরা ও বিশেষায়িত মনিটর ব্যবহার করছে।
সবকিছু কাদায় ডুবে গেছে
ইউএস জিওলজিক্যাল সার্ভে জানিয়েছে, চীন-নেপাল সীমান্তে এই দুর্যোগটি একটি হিমবাহ ধসের কারণে ঘটেছিল।
এদিকে, কাজের সুবিধার্থে ভারতের বিশেষায়িত টানেল-উদ্ধারকারী দল এবং চীনা উদ্ধারকারী দলও এই অভিযানে যোগ দিয়েছে।
এভারেস্টসহ বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গগুলোতে পর্বতারোহীদের নিয়মিত সাহায্য করা নেপালের বিশেষজ্ঞ পর্বত উদ্ধারকারী দলগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত অন্য একটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রে নিখোঁজদের সন্ধানে যোগ দিচ্ছে।
অন্যান্য জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের বন্যা থেকে বেঁচে ফেরা প্রত্যক্ষদর্শীরা মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে তীব্র পানির তোড় তাদের কীভাবে গ্রাস করেছিল তার ভয়াবহ বিবরণ দিয়েছেন।
ভারতের অন্ধ্র প্রদেশ রাজ্যের অধিবাসী ৩৩ বছর বয়সী জলবিদ্যুৎ কর্মী সুরেন্দ্র দৌলুরী বর্ণনা করেছেন কীভাবে তার কর্মস্থল 'আপার ত্রিশূলী-১' সাইটটিকে গর্জে ওঠা পানি ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল।
রোববার কাঠমান্ডুতে এএফপিকে আগের দিন উদ্ধার হওয়া দৌলুরী বলেন, ‘আমরা অত্যন্ত বিকট একটি শব্দ শুনতে পাই... এবং দেখি যে, টারবাইনের মেঝেকে কাদা-পানি পুরোপুরি গ্রাস করেছে এবং সেখানে ছয়জন শ্রমিক আটকে পড়েছেন।’
শ্রমিকরা কীভাবে প্রবল স্রোতের নাগালের বাইরে থাকা উঁচু স্থান বা নির্মাণাধীন এলাকায় আশ্রয় নিয়েছিলেন তার বিবরণ দিয়ে সুরেন্দ্র দৌলুরী বলেন, ‘আমরা তাদের মধ্যে পাঁচজনকে উদ্ধার করতে সক্ষম হলেও একজন প্রাণ হারিয়েছেন।’
নেপাল বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মোট ৪৩১.১ মেগাওয়াট সম্মিলিত ক্ষমতার ১১টি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং একটি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। কর্তৃপক্ষের মতে, এগুলো নেপালের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার প্রায় ১০ শতাংশের কাছাকাছি।
এছাড়া ৪৭০ মেগাওয়াট সম্মিলিত ক্ষমতার নির্মাণাধীন আরও ১৫টি বিদ্যুৎ প্রকল্পও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক